পুলিশ এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক (পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট) সুমিত রায়কে। দলে কোনও বড় পদে না থেকেও তৃণমূল জমানার অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই সুমিত রায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর নামে একাধিক ফ্যান পেজ। কেউ কেউ বলতেন, বস। কারও কাছে ছিলেন দাদা।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠবৃত্তের একজন হলেন সুমিত। শোনা যায়, অভিষেকের সঙ্গে একই স্কুলে ও ক্লাসে পড়লেও, অভিষেককে বরাবর স্যর বলেই ডাকেন সুমিত। এখন প্রশ্ন হল, কে এই সুমিত রায়?
অভিষেকের রাজনৈতিক কেরিয়ার যখন থেকে শুরু, তখন থেকেই সঙ্গী সুমিত। দক্ষিণ কলকাতার নবনালন্দা স্কুলে পড়তেন অভিষেক। সুমিতও অভিষেকের সহপাঠী ছিলেন নবনালন্দায়। অভিষেক এখানে পড়াশোনার পরে দিল্লিতে চলে যান। তবে সুমিতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল।
অভিষেক দিল্লি থেকে পড়াশোনা সেরে ফিরে যখন সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিলেন, সুমিতও সঙ্গে রয়ে গেলেন। দলের অন্দরে শোনা যেত, সুমিতের প্রভাব শুধু দলেই নয়, প্রশাসনেও ছিল বেশ মজবুত। তৃণমূলের নেতা, কর্মীদের কথায়, 'সুমিত কখনও নির্বাচনের রাজনীতি করেননি, কিন্তু অভিষেকের কাছে পৌঁছতে গেলে সুমিতই ছিলেন মূল ফটক।' সুমিতকে টপকে অভিষেক পর্যন্ত পৌঁছনো যেত না।
অভিষেকের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুমিতের কাছেই ধর্না দিতে হত
২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজনীতিতে এন্ট্রি হয় অভিষেকের। তৃণমূল যুবা তৈরি হল। অভিষেক হয়ে উঠলেন তৃণমূল কংগ্রেসের যুবনেতা। তখন সুমিত ঘনিষ্ঠবৃত্তে ছিলেন না।
ওই সময়ে অভিষেকের সবচেয়ে কাছাকাছির বৃত্তে থাকতেন বিনয় মিশ্র, প্রতীক দেওয়ান, রোহিত আগরওয়াল, করণ শর্মারা। পরবর্তী সময়ে কয়লাপাচার মামলায় বিনয়ের নাম জড়িয়ে যায়। বিনয় সরে যান। বাকিরাও অভিষেক থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে, তখনই সুমিতের এন্ট্রি।
জেলার এক তৃণমূল নেতার কথায়, 'আমরা জেলা থেকে অভিষেকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। ৫ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে,তারপর সুমিত জানিয়েছিল, আজ দেখা হবে না।'
ডায়মন্ড হারবার মডেল ও সুমিত রায়
অভিষেকের সংসদীয় এলাকা ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন চালাত মূলত সুমিতই। স্থানীয় নেতাদের দাবি, রাজনৈতিক হোক বা প্রশাসনিক, সুমিতের মাধ্যমেই কাজ হত। সুমিত ছিলেন বেতাজ বাদশা। অভিষেকের একদা ঘনিষ্ঠ এবং বর্তমানে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হওয়া প্রাক্তন মুখপাত্র ঋজু দত্ত বলেন, 'অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ করা যেত না। তাঁর কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিলেন সুমিতই। সুমিত রায় কে, সেটা তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়কেরা খুব ভাল করে জানেন।' অনেক তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'বস' ও সুমিত রায়কে 'ক্যাপ্টেন' বলতেন।
শালবনি জমি কেলেঙ্কারি ও সুমিত
শালবনি ও মেদিনীপুর ব্লকের প্রায় ৩০০ একর সরকারি জমি জালিয়াতি করে বিক্রি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে। অভিযোগ, এই সরকারি জমির চরিত্র বদলে প্লট করে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল। জমির চারপাশে তোলা হয় পাঁচিলও। পশ্চিম মেদিনীপুরে শালবনিতে এই জমি জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় গত ৬ জুন গ্রেফতার করা হয় সুজয় হাজরাকে। সুজয়কে জেরা করেই উঠে আসে অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের নাম। বিভিন্ন তথ্য় থেকে জানা যায়, সুজয় হাজরা ও সুমিত রায়ের মধ্য়ে কোটি টাকার ওপর আর্থিক লেনদেন হয়েছে।