এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: আপাতত একটি নতুন দলের সাংসদ হিসেবে পরিচিতি হয়েছে তাঁদের। সংসদে বসার জন্য আলাদা ঘরও হয়ে যাবে শিগগিরই। বাংলায় জেলায় জেলায় পার্টি অফিস খুলবে বলেও পরিকল্পনা রয়েছে। তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদ শিবির বদলে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই–তে যোগ দিয়েছেন।
আলাদা ব্লক হিসেবে থাকার পরিকল্পনা থেকে সরে এলেও আগামী দিনে এ নিয়ে আইনি সংঘাতের সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে। এই আবহে ২০ সাংসদকে নিয়ে কি আলাদা কোনও ভাবনা রয়েছে বিজেপি নেতৃত্বের? বা রাতারাতি ২০ সাংসদের এনসিপিআইয়েরও কি নতুন কোনও দাবি রয়েছে বিজেপির কাছে? এ নিয়ে নয়া জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজধানী দিল্লিতে। রাজনৈতিক মহলের অন্দরের খবর, এই ২০ সাংসদের মধ্যে বর্ষীয়ান সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিনেতা দীপক অধিকারী ওরফে দেবের জন্য ওয়াই ক্যাটিগরির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার একটা আলোচনা চলছে। ঠিক যেমনটা কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে দেওয়া হয়েছিল, তিনি তৃণমূলে থাকাকালীনই বিদ্রোহের আঁচ স্পষ্ট করে দেওয়ার পরে। আবার এনসিপিআইয়ের সাংসদদের মধ্যে এক বা একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেতে পারেন বলেও গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে।
রবিবার রাতের আগে পর্যন্ত এনসিপিআই দলটির কোনও পরিষদীয় বা সংসদীয় প্রতিনিধি ছিলেন না। হঠাৎ এই দলে তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদ জুড়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে এনডিএ সরকারের শরিক দলগুলির মধ্যে লোকসভায় বিজেপির পরেই সর্বোচ্চ আসন থাকা পার্টি হয়ে উঠেছে তারা। সংসদের নিম্নকক্ষে বর্তমানে বিজেপির সাংসদ সংখ্যা ২৪০, তারপরেই ছিল চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি (১৬) ও নীতীশ কুমারের জেডিইউ (১২)। অর্থাৎ, ২০ সাংসদ নিয়ে এনসিপিআই এখন এনডিএ–র দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক। তা হলে কি তাঁদের সাংসদদের মধ্যে থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী বা স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রী করা হবে— এ নিয়ে সোমবার রাজধানীতে জল্পনা তুঙ্গে। একাধিক নামও ভেসে উঠেছে এনসিপিআই থেকে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকায়। যদিও সূত্রের দাবি, এত সহজে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া কঠিন। কারণ, বিজেপির কেন্দ্রীয় ও বঙ্গ–নেতৃত্বের বড় অংশের পাশাপাশি এনডিএ–র বাকি শরিকরা এ নিয়ে কী পদক্ষেপ করবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পরপরই ‘ডেভেলপমেন্ট অফ বেঙ্গল’ নামে আলাদা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছেন সুদীপ, কাকলি–সহ ২০ জন সাংসদ, এমনই দাবি সংসদীয় সূত্রের৷ সুদীপ এ দিন দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সার্বিক ভাবে বাংলার উন্নয়নের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও যদি সিনিয়র হিসেবে আমার কাছ থেকে পরামর্শ চান, দাদা হিসেবে তাঁকে সাহায্য করতে পারি।’ তাঁর সংযোজন, ‘পার্লামেন্ট খুললে আমরা এনসিপিআইয়ের ২০ জন সাংসদ লোকসভায় থাকব। স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার পরে উনি আমাদের আলাদা অফিস দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা ২০ জন সাংসদ যেমন থাকব, তেমনই আবার আট জন সাংসদ নিয়ে আর একটি দল তৃণমূল নামে সংসদে থাকবে। তখন আমরা বলতে পারব, তৃণমূলের হয়ে আমরা ভোটে জয়ী হয়েছি। এই দলটার সিংহভাগ সাংসদ আমাদের দিকে রয়েছেন। তখন আইনি লড়াইয়ে বিষয়টি আসতে পারে।’
বিদ্রোহী শিবিরের এনসিপিআইয়ে যোগদান নিয়ে এ দিনও আক্রমণ শাণিয়েছেন তৃণমূলের কালীঘাট নেতৃত্ব। প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় এ দিন বলেন, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দলের প্রতীক ঘাসের উপরে জোড়াফুল। ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ২০ জন সাংসদ অখ্যাত একটি দল এনসিপিআইতে বেআইনি ভাবে যোগ দিয়ে এনডিএ এবং মোদীকে সমর্থন করার কথা বলেছেন। সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদকে এড়াতে ওঁরা এই কাজ করেছেন।’
এখনও কালীঘাটের ফোল্ডে থাকা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ব্যাপক ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় স্পষ্ট জানিয়েছে, মূল দল যদি ভেঙে যায় অথবা অন্য দলের সঙ্গে মিশে যায়, তবেই দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়ানো যায়।’ এই ইস্যুতে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন কংগ্রেসের একাংশও। কংগ্রেসের আইনজীবী নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির কথায়, ‘কোনও দলের লেজিসলেটিভ পার্টির দুই তৃতীয়াংশ আলাদা গ্রুপ তৈরি করলে দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর হবে না— এটা সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা। আইন যাঁরা জানেন না, তাঁরা শুধু দুই তৃতীয়াংশের কথা বলেন। প্রথমে মূল রাজনৈতিক দলকে অন্য দলের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, তবেই সেই দলের লেজিসলেটিভ পার্টির দুই তৃতীয়াংশ নতুন দলে যেতে পারবেন।’
যদিও অধুনা এনসিপিআইয়ের সদস্য, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ শতাব্দী রায়ের পাল্টা বক্তব্য, ‘সময় এর উত্তর দেবে। ওঁরা এক সময়ে বলেছিলেন, আমাদের সঙ্গে ১৯ জন নেই। আমরা তখন বলেছিলাম, ম্যাজিক ফিগার রয়েছে আমাদের সঙ্গেই। এটার ক্ষেত্রেও প্রমাণ করব, যে আমরাই ঠিক।’ নাম না–করে শতাব্দী নিশানা করেছেন তৃণমূলনেত্রীকেও। তাঁর সংযোজন, ‘একটা পরিবার যখন ভেঙে যায়, তখন পরিবারের হেডের দায়িত্ব থাকে সবাইকে নিয়ে চলার। কেন এটা হচ্ছে সেটা খোঁজ নেওয়া। সেটা কি হয়েছে? হলে তো এত জন মিলে একই সিদ্ধান্ত নিতেন না। আমি ২০০৯–এও দলের সঙ্গে ছিলাম। খারাপ সময়, ভালো সময় সবটাই দেখেছি। কখনও তো এ রকম কোনও সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি। ১৭ বছর খুব কম সময় নয় কিন্তু।’
এই শিবিরের সদস্য বাঁকুড়ার সাংসদ অরূপ চক্রবর্তীর কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সব লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী ছিলেন? বাঁকুড়া লোকসভার মানুষ প্রার্থী হিসেবে আমাকে ভোট দিয়েছেন। কেন ২০ জন ওঁদের সঙ্গে নেই? এর জন্য কে দায়ী? দল ওঁর (মমতার) একার নয়, সবাইকে নিয়ে দল করতে হয়।’ তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ এনসিপিআইয়ে যোগ দিলেও এই দল সম্পর্কে তাঁরা যে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন, তা সুদীপের কথাতেও স্পষ্ট। উত্তর কলকাতার সাংসদের কথায়, ‘এনসিপিআই দলের প্রতীক কী আমি জানি না। আমার ধারণা, চূড়ান্ত সমাধান আদালতে হবে।’
এনসিপিআইয়ে যোগদান নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরীও। তিনি বলেছেন, ‘এই ন্যাশনাল সিটিজে়ন পার্টি নামে একটি দল বাংলাদেশেও আছে। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কথা আগে বলা হতো, এখন তা হলে পার্টিও অনুপ্রবেশ করছে!’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘এনডিএ–র যাতে মন্ত্রী হওয়া যায় অথবা অপরাধী হয়েও যাতে তদন্ত এড়ানো যায়, তার জন্য এটা করা হয়েছে।’
লোকসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা ইতিমধ্যে এনসিপিআইয়ে যোগ দিয়েছেন। রাজ্যসভার সাংসদরা একে একে পদত্যাগ করছেন। কিন্তু বিদ্রোহের আগুন যেখান থেকে প্রথম ছড়িয়েছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ক্ষেত্রে কী হবে, এখনও স্পষ্ট নয়। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন এ দিনও জানিয়েছেন, সাংসদরা কী করছেন, সে ব্যাপারে তাঁরা কিছু বলতে পারবেন না। তবে তৃণমূলের আইনি অধিকার এবং প্রতীক নিয়ে টানাটানি যে খুব শিগগিরই শুরু হতে পারে— তেমনই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্রের দাবি, বিজেপি ঘনিষ্ঠ দিল্লি নিবাসী দুই বর্ষীয়ান আইনজীবী এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টে এখন গরমের ছুটি চলছে৷ জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে শীর্ষ আদালত পুরোদমে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইনি সংঘাত শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে৷ যদিও এক্ষেত্রে প্রবীণ সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচার্য বলেন, ‘সংবিধানের ১২২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে চিহ্নিত সংসদের কার্যাবলি বা প্রসিডিংসকে কোনও আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানো যায় না৷ এটা একটা বিশেষ সুরক্ষাকবচ৷ অদূর ভবিষ্যতে এই সুরক্ষাকবচ পেতে পারেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা। ফলে তাঁরা সহজেই সংসদের অধিবেশনে পেশ করা যে কোনও প্রকারের বিলে কেন্দ্রীয় সরকার তথা এনডিএ-কে সমর্থন জানাতে পারবেন৷’