এই সময়: তাপপ্রবাহ এবং ওজ়োন দূষণের মধ্যে যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তা প্রমাণ করলেন আইআইটি খড়্গপুরের ‘সেন্টার ফর ওশান, রিভার, অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড সায়েন্সের’ (কোরাল)–এর অধ্যাপক ও গবেষক জয়নারায়ণ কুট্টিপ্পুরাথ এবং কোরাল ও কেরালা ইউনিভার্সিটি অফ ফিশারিজ় অ্যান্ড ওশান স্টাডিজ়–এর পরমবত সঙ্গীতা। লন্ডনের বিখ্যাত বিজ্ঞানপত্রিকা ‘নেচার’–এর আওতাধীন এনপিজে ক্লিন এয়ার–এ দুই বিজ্ঞানীর গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
‘হিটওয়েভস ট্রিগার সিভিয়ার সারফেস ওজ়োন পলিউশন ইন ইন্ডিয়া: রিজিওনাল হটস্পটস, ট্রেন্ডস অ্যান্ড হেলথ এফেক্টস’–শীর্ষক গবেষণাপত্রটির নাম থেকেই স্পষ্ট, দেশের কোন কোন জায়গায় এবং কী ভাবে তাপপ্রবাহ ওজ়োন দূষণের কারণ হয়ে চলেছে। সাধারণত বায়ুদূষণ বললেই মাথায় আসে বাতাসে ভাসমান কণা পিএম২.৫ এবং পিএম১০–এর কথা। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে মিশে থাকা ওজ়োন গ্যাসও যে তাপপ্রবাহের সঙ্গে ‘ষড়যন্ত্র’ করে মানুষের পক্ষে প্রাণঘাতী হতে পারে — এই গবেষণাপত্র সেটাই প্রমাণ করেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারতে তাপপ্রবাহ শুধু চরম গরমের কারণই নয়, একই সঙ্গে এটি মারাত্মক বায়ুদূষণ ঘটিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এ বিষয়ে এই গবেষণাকেই প্রথম বিস্তারিত গবেষণা বলে জানানো হয়েছে।
দুই গবেষক প্রমাণ করেছেন, তাপপ্রবাহের সময়ে মাটির সঙ্গে লেগে থাকা বাতাসের স্তরে ওজ়োন গ্যাসের মাত্রাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই ওজ়োন গ্যাসটি ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই দেশে ওজ়োনের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)–র বেঁধে দেওয়া নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। তাঁরা ২০০৪ থেকে ২০২৪–এর মধ্যের তাপপ্রবাহের ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তাপপ্রবাহ চলাকালীন মাটি–সংলগ্ন ওজ়োনের ঘনত্ব প্রায়শই প্রতি ঘনমিটারে ৮৫ থেকে ১১০ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছে যায়। এই মাত্রা দেশের সব অঞ্চলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)–র নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি।
বিজ্ঞানী সঙ্গীতা এবং জয়নারায়ণের বক্তব্য, ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তর-পশ্চিম ভারত, গাঙ্গেয় সমভূমি, উত্তর-মধ্য ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পশ্চিম হিমালয় অঞ্চল। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সময়সীমায় এই অঞ্চগুলোয় সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহের নজির রয়েছে। একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে, এই এলাকাগুলোয় ওজ়োনের মাত্রা ‘হু’-র নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৩৯ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি, আর পশ্চিম হিমালয়ে এই মাত্রা সর্বোচ্চ ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।’
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪–এ তাপপ্রবাহ-জনিত ওজোন দূষণে মৃতের সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়েছিল। মৃতদের মধ্যে ইস্কিমিক হার্ট ডিজ়িজ–এ ১৫ হাজার ৬১৫ জনের এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজ়িজ-এ ১০ হাজার ৮৯৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এই দু’ধরনের শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে ওজ়োন দূষণের সম্পর্ক নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করেছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। গবেষকরা সতর্ক করছেন, বর্তমানের অধিকাংশ ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ মূলত হিট স্ট্রেস ও হিটস্ট্রোক মোকাবিলার উপরেই জোর দেয়। কিন্তু, ওজ়োন দূষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই উপেক্ষিত থাকে।
তাঁদের মতে, ওজ়োন দূষণের এই অদৃশ্য বোঝা কমানো গেলে বহু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হবে এবং ভারতের জলবায়ু-সহনশীলতাও আরও শক্তিশালী হবে। তবে তার জন্য ওজ়োনের পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা, বায়ুমান-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সতর্কতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণ মোকাবিলায় মিলিত কৌশল তৈরি করার প্রয়োজন রয়েছে।