• পরিষ্কার, ঝকঝকে আকাশ! চিন্তা বাড়াচ্ছে বৃষ্টিহীন বর্ষা
    এই সময় | ১৬ জুন ২০২৬
  • এই সময়: ইনস্যাট থ্রি–ডিএসের ইনফ্রারেড রেডার থেকে হঠাৎ উধাও দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর তৈরি করা মেঘের স্তূপ। গত ৪ তারিখ কেরালা দিয়ে ভারতে ঢুকেছে মৌসুমি বাতাস। তার পরে ৯ জুন উত্তরবঙ্গে এবং ১২ জুন কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের প্রায় পুরোটাই দখল করে বর্ষার মেঘ। তবে ওই পর্যন্তই, গত তিন দিন এক ফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি কলকাতা এবং আশপাশে। বর্ষার মেঘ ঢোকার দিন বৃষ্টি হয়নি, এমন নজির ছ’বছরে নেই। আর ‘আনুষ্ঠানিক ভাবে’ মনসুন চলে আসার তিন দিন পরেও বৃষ্টি অমিল — সেই উদাহরণ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন আবহবিদরা।

    ‘এল নিনিও’ পরিস্থিতিতে (প্রশান্ত মহাসাগরের জলতল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হলে) ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। এ বছর জুলাইয়ে আবার প্রশান্ত মহাসাগরে ‘সুপার এল নিনিও’–র পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহবিদরা। সেই প্রেক্ষাপট তৈরিও হয়ে গিয়েছে বলে আশঙ্কা। তাই কি এমন অবস্থা বর্ষার? দেশের দক্ষিণ ও মধ্যভাগে অগ্রসর হওয়ার ক’দিনের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির এই ঘাটতিতে উদ্বিগ্ন আবহবিদরা।

    মৌসম ভবনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে দেশে গড় বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৯.২ মিমি। অথচ এই সময়ের মধ্যে ভারতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ থাকে ৫৩.৭ মিমি। ফলে বর্ষা শুরুর প্রথম ১০ দিনেই দেশজুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি ৬৪ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা মধ্য, দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকলে দেশের বিরাট অংশে যে মেঘমালার বিস্তার দেখা যায়, ১৫ জুনের উপগ্রহচিত্রে তার দেখা মেলেনি। উল্টে দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের বড় অংশের আকাশ পরিষ্কার! সবচেয়ে বেশি মেঘ দেখা যাচ্ছে হিমালয়, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং গাঙ্গেয় সমভূমির উত্তরাংশে। উল্টো দিকে আরব সাগর শাখার মৌসুমি বায়ু দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন।

    আবহবিদদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে ভূ–পৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার উপরে বায়ুমণ্ডলে বড়সড় টানাপড়েন! ওয়েস্টারলি জেট স্ট্রিম বা বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকের স্তরে পশ্চিম থেকে পূর্বে বয়ে যাওয়া দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ এ বছর স্বাভাবিকের থেকে অনেকটা দক্ষিণে সরে অবস্থান করছে। বাতাসের এই স্রোত বাধা দিচ্ছে ইস্টারলি জেট বা পুবালি জেট প্রবাহের কাজে। ভারতে মৌসুমি বায়ু চলাচল বজায় রাখা এবং বজ্রগর্ভ মেঘ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই ইস্টারলি জেটের। কিন্তু এ বার ওয়েস্টারলি জেটের অবস্থান বদলের ফলে মানচিত্রে মৌসুমি বায়ু অগ্রসর হলেও বৃষ্টি নামাতে ওই বাতাস ব্যর্থ হচ্ছে। একে ‘মনসুন পজ়’ বলছেন আবহবিদরা।

    আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ‘স্কাইমেট’–এর মতে, আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ সময় ধরে উল্লেখযোগ্য কোনও নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ তৈরি হয়নি। এমন ওয়েদার সিস্টেম সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুকে স্থলভাগের দিকে টেনে আনে। কিন্তু এ বার সেটা না–হওয়ায় নিজের স্বাভাবিক প্রবাহেই নির্ভরশীল বর্ষা। তাই অগ্রগতি ধীর এবং অসম।

    আবহবিদদের মতে, মনসুন সব সময়ে একই গতিতে উত্তর দিকে এগোয় না, কয়েকটি ধাপে অগ্রগতি ঘটে। কখনও দ্রুত বিস্তার হয়, আবার কখনও কিছুদিন গতি কম থাকে। তারপর ফের সক্রিয় হয় মৌসুমি বায়ু। এ বছর সেই প্যাটার্নই দেখা যাচ্ছে।

    বঙ্গোপসাগরে নতুন কোনও ওয়েদার সিস্টেম তৈরি হওয়ার উপরে অনেকটাই নির্ভর করছে বর্ষার ভবিষ্যৎ। দ্রুত কোনও নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত তৈরি না হলে মনসুন এমন ধীর গতিতেই এগোবে।

  • Link to this news (এই সময়)