এই সময়, হাওড়া ও মধ্যমগ্রাম: শিবপুর বটানিক গার্ডেন থেকে নাজিরগঞ্জ হয়ে মিনিট কুড়ি গাড়িতে গেলেই হাওড়ার সাঁকরাইলের হাটগাছা গ্রাম। বাসুদেবপুর মোড়ে রাস্তার পাশেই রয়েছে গাছ–গাছালিতে ঘেরা একটা ছিমছাম দোতলা বাড়ি। দেওয়ালে বড় হরফে লেখা ‘জাগো বিশ্ব’। তার পাশেই লেখা ‘অসংগঠিত মহিলা কর্মী অ্যাসোসিয়েশন’।
বাড়ির দেওয়ালে সবুজ রং, মূল প্রবেশদ্বারের সামনের অংশটা অবশ্য গেরুয়া। সবুজ ও গেরুয়ার এই অদ্ভুত মেলবন্ধন নিয়ে অবশ্য এতদিন কেউ মাথা ঘামায়নি। পাড়া–পড়শিরা শুধু এটুকুই জানতেন, এই বাড়ির লোকেরা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করে থাকেন। কিন্তু এই সাদামাটা বাড়িতে যে কোনও রাজনৈতিক দলের অফিস রয়েছে, সেটা এতদিন টেরই পাননি এলাকার মানুষ। সোমবার সকালে টিভির পর্দায় সেই বাড়ির ছবি ভেসে উঠতেই হকচকিয়ে যান অনেকে। সকাল থেকে বাড়ির সামনে পুলিশে ছয়লাপ। হাজির কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। প্রায় দুর্গের চেহারা নিয়েছে গোটা এলাকা।
ভোর থেকেই চলছে লাইভ সম্প্রচার। বাড়িতে ঢুকতে গেলে রীতিমতো গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে পুলিশ। টিভি দেখেই গ্রামবাসীরা জানতে পারলেন, এতদিন যে বাড়িটির দিকে তাঁরা ফিরেও তাকাননি, সেখানেই রয়েছে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজে়ন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’র (এনসিপিআই) রাজ্য সদর কার্যালয়। কয়েক ঘণ্টা আগেই তৃণমূলের সঙ্গ ত্যাগ করে মোট ২০ জন সাংসদ যোগ দিয়েছেন এই দলে। তারই জেরে রাতারাতি ‘ভিআইপি–জ়োন’ হয়ে উঠেছে অখ্যাত হাটগাছা গ্রাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, যে ঠিকানায় এনসিপিআইয়ের অফিস, সেখানে ‘জাগো বিশ্ব’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থারও অফিস রয়েছে। তারা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম করে থাকে। একটি বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো এখান থেকে। কখনও এই অফিস থেকে কম্বল, জামাকাপড় ও বই বিতরণ করা হতো। বেশ কয়েকবার আইনি সচেতনতা শিবিরেরও আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে যে কোনও রাজনৈতিক দলের অফিস চলে, এই খবরটা খুব কম লোকই জানতেন। নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড অবশ্য বলছে, ২০২২–তে ওই বাড়ি থেকেই এনসিপিআই দলের পথচলা শুরু। এই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী শিউলি কুণ্ডু এবং তাঁর স্বামী উত্তীয় কুণ্ডু। যাঁরা আবার ‘জাগো বিশ্ব’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে প্রথম থেকেই যুক্ত রয়েছেন। এ দিন শিউলি বলেন, ‘ভালোই তো হলো। ২০ জন সাংসদ যোগ দেওয়ায় দল আরও বড় হবে।’ উত্তীয়র ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
এতবড় খবরটা সংবাদমাধ্যম থেকেই জানতে পারেন এনসিপিআই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তথা মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা শান্তনু দে। তাঁর কথায়, ‘তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা কাদের মাধ্যমে আমাদের দলে আসতে চাইছেন, সেটা আমি জানি না। তবে আমাদের দলে ১৫–২০ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রয়েছেন। আমার সঙ্গে তাঁদের কারও যোগাযোগ হয়নি। তবে আগামীতে ওঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠিক করা হবে।’ এই বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের দলবদল নিয়ে শান্তনুর বক্তব্য, ‘রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু হয় না। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সাংবিধানিক নিয়ম মেনে ওঁদেরকে দলে নেওয়া হবে। তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাঁদের বিষয়েও ভেবে দেখা হবে।’
শিউলি এবং উত্তীয়র কন্যা দীপান্বিতা কুণ্ডু সোমবার বলেন, ‘আমার বাবা ও মা এনসিপিআই দলের প্রতিষ্ঠাতা। তবে এই দল নির্বাচনে খুব একটা লড়েনি। গত পঞ্চায়েত ভোটে দলের হয়ে দু’–একজন প্রার্থী হলেও তাঁরা খুব সামান্য ভোট পেয়েছিলেন।’
২০২৩–এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাঁকরাইলের দুইল্যা গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে এনসিপিআইয়ের হয়ে ভোটে লড়েছিলেন শিপ্রা দাস। তিনি বলেন, ‘গত পঞ্চায়েত ভোটে আমি লড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ফল আশানুরূপ হয়নি। আমি মাত্র ৩০টি ভোট পেয়েছিলাম।’ তবে দল হঠাৎ করে বড় হয়ে যাওয়ায় তিনিও নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি যখন দাঁড়িয়েছিলাম, তখন দল খুব ছোট ছিল। কিন্তু এখন যদি ২০ জন সাংসদ দলে যোগ দিয়ে থাকেন, তা হলে দলের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুরাম বোধক বলেন, ‘শিউলি কুণ্ডু এবং তাঁর স্বামী উত্তীয় কুণ্ডু বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওঁদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমি নিজেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি। দু’জনেই গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করতেন, নানা জায়গায় যেতেন। এখন শুনছি, বহু সাংসদ ওঁদের দলে যোগ দিয়েছেন। খবরটা শুনে ভালোই লাগল। আরও খুশি হব, যদি আমাদের এলাকার কিছু উপকার হয়। বিশেষ করে রাস্তার অবস্থা খারাপ। রাস্তাটা যদি ভালো হয়, আমাদের খুব উপকার হবে।’ প্রতিবেশী অখিল গিরির কথায়, ‘প্রথম দিকে ওঁরা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। একবার পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থীও দিয়েছিলেন। তারপরে আর কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ওঁদের দেখতে পাইনি।’
তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ রবিবার এনসিপিআইয়ে যোগদান করার পরেই দলের নতুন ‘ফেসবুক পেজ’ খোলা হয়েছে। যদিও সেটা অফিশিয়াল পেজ নয় বলেও তাতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই ফেসবুক পেজে তৃণমূলের যে বিদ্রোহী সাংসদরা দলে যোগদান করেছেন, তাঁদের ছবি পোস্ট করে দলে ‘স্বাগত’ জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বলা হয়েছে, ‘২০ টি আসন থাকায় পশ্চিমবঙ্গে এনসিপিআই বৃহত্তম সংসদীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভাব করেছে। সংখ্যাই সব কথা বলে।...পিপল ফার্স্ট, নেশন অলওয়েজ়।’