আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন হাবড়া। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। সেই স্টেশন চত্বরেই রেলের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান, বস্তি ও বিভিন্ন নির্মাণ উচ্ছেদ করতে সোমবার গভীর রাতে বড়সড় অভিযান চালাল প্রশাসন।
রাতভর চলা এই উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক রাজ্য পুলিশ, জিআরপি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বহু বছর ধরে হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেলের জমি দখল করে ছোট-বড় অসংখ্য দোকান, অস্থায়ী বসতি এবং কিছু পাকা নির্মাণ তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ, এই অবৈধ দখলের কারণে স্টেশন এলাকায় যাত্রী চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছিল।
বিশেষ করে অফিস টাইমে স্টেশনের সামনে চরম যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হত। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, বহু বার সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।
রেল সূত্রে জানানো হয়েছে, অবৈধ দখল সরানোর জন্য আগেই সংশ্লিষ্ট দোকানদার ও বসবাসকারীদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশে জানানো হয়েছিল, ১৫ জুনের মধ্যে রেলের জমি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জায়গা খালি না করলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। তবে সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অধিকাংশ দোকানদার ও দখলকারীরা নিজেরা জায়গা ছাড়েননি।
এরপরই প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সোমবার রাতে প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকা নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়। বনগাঁ-বারাসত জিআরপি, রাজ্য পুলিশ, রেল পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়।
মাইকিং করে এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের জমি খালি করার জন্য শেষবার সতর্ক করা হয়। এরপর একাধিক বুলডোজার, জেসিবি এবং ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রশাসনিক কর্মীরা এলাকায় ঢুকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন।
প্রথমে স্টেশন চত্বরের আশেপাশে থাকা অস্থায়ী দোকান ও হকারদের কাঠামো ভাঙা হয়। এরপর ধাপে ধাপে রেলের জমির উপর তৈরি পাকা নির্মাণগুলিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। রেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেআইনিভাবে রেলের জমি দখল করে একাধিক পাকা ঘর তৈরি করা হয়েছিল, যা নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়ে উঠেছিল।
অভিযান চলাকালীন একটি বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
দলীয় পতাকা হাতে কিছু বাম কর্মী-সমর্থক স্টেশন চত্বরে বিক্ষোভ দেখান। এমনকী, বুলডোজারের সামনে বসে পড়েও বিক্ষোভ দেখান বাম কর্মী সমর্থকরা। অভিযোগ, প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলীয় কার্যালয় ভেঙে দিয়েছে।
যদিও প্রশাসনের দাবি, রেলের জমিতে থাকা সমস্ত অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধেই সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এক হকার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে দোকান করে সংসার চালিয়েছি। প্রশাসন আগে নোটিশ দিলেও কোথায় যাব, কী করব বুঝে উঠতে পারিনি। সব ভেঙে দিল। পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না।’
প্রশাসনের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি দখলদারদের একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়েছিল জায়গা খালি করার জন্য। তা সত্ত্বেও কেউ ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইন মেনেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
রাতভর চলা উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে বড় কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও এলাকায় এখনও চাপা উত্তেজনা রয়েছে। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছেন জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রেলের জমি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত।