রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক নতুন প্রবণতা ক্রমশ নজর কাড়ছে, তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে ডিম ছোড়ার ঘটনা। গত কয়েক সপ্তাহে এমন একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে বাংলা। শুধু ডিম নিক্ষেপ নয়, এই ঘটনাগুলি রাজনৈতিক অপমান, জনরোষ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কও উসকে দিয়েছে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে একাধিক তৃণমূল নেতা পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই ডিম হামলার শিকার হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনও দৃশ্যমান পুলিশি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অনেকের অভিযোগ, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীরা নিজেদের সুরক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন, কিন্তু যাঁদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তাঁদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে ততটা সক্রিয় ছিলেন না।
একের পর এক ডিম হামলা
৯ জুন বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র সব্যসাচী দত্তকে গ্রেফতারের পর আদালত চত্বরে তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর একাধিক ডিম ছোড়া হয়। অভিযোগ, অন্তত আটবার ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং চারটি ডিম সরাসরি তাঁর গায়ে লাগে। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট অপমানজনক বলেই মনে করা হচ্ছে।
এর আগে ৭ জুন পাটুলির তৃণমূল কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তকে ডিমের আঘাত থেকে বাঁচাতে পুলিশকে কার্যত তাঁকে টেনে গাড়িতে তুলতে দেখা যায়।
৫ জুন তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তদন্তের কাজে সল্টলেকে নিয়ে যাওয়া হলে বাইরে অপেক্ষমাণ জনতার ভিড় দেখে তিনি প্রথমে গাড়ি থেকে নামতেই চাননি। পরে নামার পর তাঁকেও লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তিনটি ঘটনাতেই পুলিশকর্মীদের মাথায় হেলমেট ও হাতে শিল্ড দেখা গেলেও হামলাকারীদের আটকানোর তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সমালোচকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে।
৩০ মে সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার পর থেকেই এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। রাজনৈতিক মহলের দাবি, গত দুই সপ্তাহে অন্তত এক ডজন তৃণমূল নেতা ও কর্মী একই ধরনের অপমানজনক পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
মানবাধিকার ও আইনি প্রশ্ন
মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের মতে, কোনও ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেও আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্দোষ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। তাই তাঁর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব।
একজন ফৌজদারি আইনজীবীর মতে, ডিম নিক্ষেপও আইনের চোখে অপরাধ হতে পারে। বেআইনি জমায়েত, সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার মতো ধারায় মামলা করা সম্ভব।
এক অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস আধিকারিক প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় জমায়েত, ডিমের মজুত এবং পরিকল্পিত বিক্ষোভ সম্পর্কে পুলিশের কাছে আগে থেকে কোনও তথ্য ছিল না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
জনরোষ না রাজনৈতিক বার্তা?
পুলিশের একাংশ অবশ্য মনে করছে, এই ঘটনাগুলি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, পরিস্থিতি জোর করে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে উল্টে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারত।
কলকাতা পুলিশের এক প্রাক্তন কমিশনারের কথায়, 'এগুলো বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আগে মানুষ ভয় পেত, এখন সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসছে।'
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
কুণাল ঘোষকে লক্ষ্য করেও ডিম
এই বিতর্কের মধ্যেই সোমবার সন্ধ্যায় কালীঘাটে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে ডিম হামলার শিকার হন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ।
সন্ধে সাড়ে ৬টা নাগাদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় চন্দন নামে এক ব্যক্তি তাঁর দিকে ডিম ছোড়েন বলে অভিযোগ। ডিমটি কুণালের মাথায় গিয়ে লাগে এবং সেখানেই ভেঙে যায়।