হাসিমুখে শুভেন্দুর সভামঞ্চে, দিন বদলে পাহাড়ের রাশ ফের গুরংয়ের হাতে!
প্রতিদিন | ১৬ জুন ২০২৬
২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের দার্জিলিংয়ে বিমল গুরুংয়ের গোপন ডেরায় অভিযান চালাতে গিয়ে ‘খুন’ হয়েছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিক। সেই ঘটনায় সরাসরি জড়িয়েছিল বিমল গুরুংয়ের নাম। তরুণ পুলিশ অফিসারের মৃত্যু সেসময় নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা রাজ্যকে। ওই ঘটনার পরে দীর্ঘদিন ফেরার ছিলেন গুরুং। ওই ঘটনার পর পাহাড়ে এই গোর্খা নেতার প্রভাব কমতে থাকে। শৈলশহরে নেতা হিসেবে উঠে আসতে থাকেন মদন তামাং, অজয় এডওয়ার্ড, অনীত থাপারা। পাহাড়ের রাজনীতির সমীকরণ বদলায়। প্রশ্ন উঠেছিল, তাহলে কি পাহাড়ে বিমল গুরুং ইতিহাস হয়ে গেলেন? যদিও এই সময়ের মধ্যে তিস্তা দিয়ে বয়ে গিয়েছে বহু জল। সময়ের চাকাও ঘোরে। ফের পাহাড়ের রাজনীতিতে দেখা যায় বিমল গুরুংকে।
পাহাড়ের রাজনীতিতে আরও গুরুত্ব বাড়ছে বিমল গুরুংয়ের? বিধানসভা নির্বাচনে পাহাড়ে পদ্ম ফোটানোর অন্যতম কারিগর এই গোর্খা নেতা। তৃণমূলকে পাহাড়ে কার্যত ‘ওয়াশ আউট’ করার নেপথ্যেও তিনি। এমনই মনে করেছে ওয়াকিবহাল মহল। আজ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু শুভেন্দু অধিকারী পাহাড়ে গিয়ে একাধিক উন্নয়নের বার্তা দিয়েছেন। জিটিএ দুর্নীতি নিয়েও ফাইল খোলা হবে। সেই জোরালো বার্তা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, পাহাড়ে শিক্ষক নিয়োগও স্বচ্ছভাবে হবে, সেই কথা শোনা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর গলায়। এদিন মঞ্চে বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে বিমল গুরুংকেও দেখা গিয়েছে হাসিমুখে। প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড়ে কি তাহলে ফের গুরুং প্রভাব বাড়ছে?
এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই বিজেপিকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন গোর্খা নেতা বিমল গুরুং। শুধু তাই নয়, পাহাড় ও সমতলে প্রচারেও ঝড় তুলেছিলেন এই গোর্খা নেতা। জিএনএলএফ কর্মীরাও প্রচারে ছিলেন পুরোদস্তুর। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাহাড়ে প্রচারে এসে জানিয়েছিলেন, তৃণমূল আমলে গোর্খাদের উপর দেওয়া মিথ্যা মামলা বঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন হলে তুলে নেওয়া হবে। আজ, মঙ্গলবার শুভেন্দু অধিকারী সেই কথা আরও একবার জানিয়েছেন। রাজ্য সরকার সেই বিষয়ে কাজ শুরু করছে বলেও শোনা গিয়েছে। বিমল গুরুংয়ের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা আছে। তাহলে সেসবও কি তুলে নেওয়া হবে? সেই চর্চা শুরু হয়েছে।
বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠনের পরে বিমল গুরুংয়ের প্রভাব পাহাড়ে ফের বাড়ছে। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাও অক্সিজেন পেয়েছে। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই মুহূর্তে পাহাড়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীও দেখা যাচ্ছে না। ভোটে হেরে অজয় এডওয়ার্ড ও অনীত থাপারা এখন কার্যত ঘরবন্দি। তাঁদের ফোন করা হলেও ফোন তোলেননি। এদিকে পাহাড়ে একাধিক কর্মসূচি করছেন গুরুং। জিটিএ দুর্নীতি নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। আন্দোলন কর্মসূচিরও ডাক দিয়েছিলেন। বাম আমলে সুবাস ঘিসিংয়ের পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের শেষকথা ছিলেন এই বিমল। এর মধ্যে তিস্তা দিয়ে প্রচুর জল বয়ে গিয়েছে। তৃণমূল জমানায় পাহাড়ে একসময় কোণঠাসা ছিলেন তিনি। পাহাড়ে তাঁকে দীর্ঘদিন দেখাও যায়নি। অবশেষে ফের পাহাড়ের মাটিতে প্রকাশ্যে দেখা যেতে থাকে এই গোর্খা নেতাকে। রাজনীতি থেকে সন্ন্যাসগ্রহণের প্রয়োজন হল না। উলটে তিনিই এখন পাহাড়ের ‘কিং মেকার’, এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এক সময় পাহাড়ের শেষ কথা ছিলেন সুবাস ঘিসিং। ২০০৭ সালে সেই ঘিসিংকে নির্বাসনে পাঠিয়ে উত্থান বিমল গুরুংয়ের। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতৃত্বে ফের গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে রক্তক্ষয়ী হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। এরপর ভোটের রাজনীতিতে ওই দাবি হয়ে ওঠে ‘তুরুপের তাস’। রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০০৯ নির্বাচনে গুরুংয়ের হাত ধরে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে গেরুয়া শিবিরের যে উত্থান ঘটে, তার পিছনে ছিল জাতিসত্তার আবেগ। সেই আবেগ ক্যাশ করে এরপর ২০১৪ এবং ২০১৯ সাধারণ নির্বাচনে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র গেরুয়া শিবিরকে উপহার দিয়ে গুরুং হয়ে ওঠেন পাহাড়ের ‘কিং মেকার’। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে সেই ট্র্যাডিশন অব্যাহত রাখেন গুরুং। বিজেপির সঙ্গে জোট করে পাহাড়ের তিনটি আসন ঘরে তুলে নেন।