বুদ্ধদেব বেরা, কৌশিক ভট্টাচার্য
‘ফুলমণি, আপনি ডিম খান?’
মাথা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে রয়েছে। দেখলে মনে হবে, যেন ঢুলছেন। প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে চাইলেন আমলাশোলের ফুলমণি শবর। নাকটা একবার টানলেন। যেন গন্ধ নিচ্ছেন। পরক্ষণেই বলিরেখা ভর্তি মুখে হাসি ফুটে উঠল। মাথা আরও একবার চুলকে বললেন, ‘না গো বাবু, ভাত আর তরকারি, ডিম কোথায় পাব?’
ইটের গাঁথনির দু’টো ঘর। মাথায় অ্যাসবেস্টসের ছাদ। সামনে এক চিলতে উঠোন। সেখানেই একটা ফুটিফাটা মাদুরের উপরে দু’পা ছড়িয়ে বসে রয়েছেন অশীতিপর ফুলমণি। ঘরের চালেও ছোট, বড় বেশ কয়েকটা ফুটো। বর্ষায় জল পড়ে, অন্য সময়ে রোদ। এই নিয়েই জীবন।
ফুলমণির পিছনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা একটা লাঠি। ওটাই ওঁর একমাত্র সম্বল। চোখে ভালো দেখেন না। তবে স্মৃতি টনটনে। ২০০৪-এ সেই অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। থাকবে না-ই বা কেন? মৃতের তালিকায় নাথু শবরের নামও যে ছিল। তিনি ফুলমণির স্বামী। না খেতে পেয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল সেই সময়ে।
ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির কোলে ছোট্ট গ্রাম আমলাশোল। ছোট ছোট পাহাড়, শাল-পলাশ-কেন্দুর বন আর টলটলে জলের ঝিল। দু’হাত উপুড় করে দিয়েছে জঙ্গলমহলের প্রকৃতি। সেই লোভেই ইদানীং পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন। বেশ কিছু হোম স্টে-ও হয়েছে। রঙিন ঘরে রাত্রিযাপন, ইতিউতি বন্যপ্রাণীর ডাক, জঙ্গলের হাতছানি। কিন্তু আমলাশোলের গা থেকে এখনও অনাহারের গন্ধ যায়নি। যেমন যায়নি কালাহান্ডির গা থেকে।
২০০৪ সাল আমলাশোলের গায়ে দগদগে ঘা। শত ওষুধেও সারে না। অনাহার আর অপুষ্টিতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ। শোরগোল পড়েছিল গোটা রাজ্যে। পাড়ার রকে, চায়ের আড্ডায় তখন মুখে মুখে ফিরছে সনাতন মুড়া (৪৭), সময় শবর (৫৩), মঙ্গলী শবর (৩০), নাথু শবর (৫৫-৬০) আর শম্ভু শবরের (৫০) নাম। ডিম তাঁরা চোখেও দেখেননি। ডিম সিদ্ধ, পোচ, ঝোল তাঁদের কাছে চাঁদ ধরার মতোই অলীক।
পাতে পড়ে না ঠিকই। তবে ইদানীং ডিমের কথা রোজই কানে আসে ফুলমণিদের। রাজ্যে পালাবদলের পরে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের দেখলেই ডিম ছুড়ে মারছে ক্ষুব্ধ জনতা। গায়ের জ্বালা মিটিয়ে নিচ্ছে তারা। ফুলমণি, শুকদেব শবরদের বাড়িতে এলইডি টিভি নেই। তবে গ্রামে কারও কারও স্মার্টফোন আছে। ডিম ছোড়ার খবর শুনে গা খচখচ করছে। ইস, না খেয়ে ছুড়ছে! কত ডিম নষ্ট। ফুলমণির বাড়ির পাশেই থাকেন শুকদেব। নাক-মুখ কুঁচকে বললেন, ‘ডিম খেতে পেলে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের মরতে হতো না গো।’
সকাল হলেই বাড়ির ছেলে-বৌরা দলবেঁধে জঙ্গলে যায়। সারাদিন কাঠকুটো তোলে। সঙ্গে শাল, কেন্দুপাতা, গাছের লতা। ফিরতি পথে এই সব বিক্রি করে হাতে দু’টো টাকা আসে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে চাল, ডাল আর সরষের তেল কিনে হাসিমুখে বাড়ি ফেরে তারা। উনুনে রান্না বসায়। গরম ভাতের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
শুকদেব জোয়ান ছেলে। রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। বয়স বড়জোড় ৩৫ হবে। ২০০৪-এর কথা তাঁর মনে নেই। কাঁধের থলিটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, ‘আমি তখন খুব ছোট। পরে শুনেছি, না খেতে পেয়ে পাঁচ জন মরে গিয়েছিল।’ তৃণমূল নেতাদের ডিম ছোড়ার খবর তিনি টিভি-তে দেখেছেন। চোখেমুখে অস্বস্তি নিয়ে বললেন, ‘তখন এত দোকানপাট ছিল না। ডিম কিনতে গেলে যেতে হতো ঘাটশিলা বা বেলপাহাড়ির বাজারে। এখন অবস্থা বদলেছে।’ বোকা বোকা হাসি নিয়ে দু’দিকে ঘাড় হেলিয়ে বললেন, ‘না, না, এখনও প্রতিদিন পাতে ডিম জোটে না আমাদের।’
রেশনে চাল পান ফুলমণিরা। মোটা চাল। কাঁকড় একটু থাকে বটে, তবে ওটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। পেট ভরে, সেটাই আসল। না খেতে পেয়ে তো মরতে হয় না। সময় শবর আর মঙ্গলী শবর সম্পর্কে বাবা-মেয়ে। ২০০৪-এ দু’জনেরই অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ। সময়ের এক ছেলে, নাম বুধু শবর। কয়েক বছর আগে রোগে ভুগে মারা যান। বাড়িতে এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন তাঁর স্ত্রী বেদনি শবর।
লতাপাতা কুড়িয়ে মহাজনের কাছে বিক্রি করেন বেদনি। দিন কেটে যায়। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘রেশনের চাল পাই। সঙ্গে যে টুকু রোজগার হয়, তাতেই চলে যায়।’ ডিমের কথা শুনে হেসেই ফেললেন। বড় মর্মান্তিক হাসি সেই। বলেন, ‘এখন তো শুনছি, চারদিকে ডিম ছোড়াছুড়ি হচ্ছে। এত ডিম যদি তখন থাকত, আমার শ্বশুর আর ননদটাকে মরতে হতো না।’
মৃত্যু বড় রহস্যময়। সরকার কোনও মতেই মানতে চায় না, অনাহারে মৃত্যুর কথা। পশ্চিম মেদিনীপুরের তৎকালীন জেলাশাসক চন্দন সিংহও বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছেন ফুৎকারে। ‘কিন্ডলিং অব অ্যান ইনসারেকশন: নোটস ফ্রম জঙ্গলমহলস’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, সনাতন যথেষ্ট অবস্থাপন্ন ছিলেন। নাথু শবর নাকি সেই দিন মদ্যপান করেছিলেন কিঞ্চিৎ। শম্ভু, সময়দেরও অনাহারে নয়, যক্ষায় মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। তবে আমলাশোল নিয়ে দেশে-বিদেশে যত কাজ হয়েছে, তাঁরা কেউই এই দাবির সঙ্গে একমত নন। সরকারি অব্যবস্থার দিকেই আঙুল তুলেছিলেন প্রত্যেকে। এমনকী ডেনমার্কের গবেষক অলিভার রুবেন পর্যন্ত।
তৎকালীন জেলাশাসকের দাবি মানতে নারাজ ফুলমণিও। মুখে একটা মাছি বসেছিল। কাঁধের গামছাটা তার দিকে হাওয়ায় ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ও (নাথু শবর) রাতে ফিরলে অল্প কিছু খেতে পেতাম। কোনও দিন তা-ও জুটত না। না-খেতে পেয়ে বেচারা মরেই গেল।’ ‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার’। আজও খাবারের আশায় উঠোনে বসে রয়েছেন ফুলমণি। বৌ আর ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছে ছেলে সনাতন। মহাজনের কাছে কাঠকুটো বেচে ফিরবে। তার পরে হাঁড়ি চড়বে।
সন্ধ্যা নামছে। ফুটফাট আলো জ্বলে উঠছে হোমস্টেতে। শহরের দাদাবাবুরা বেড়াতে এসেছেন। ধামসা-মাদল বাজছে। মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বিলিতি পারফিউম। বার্বিকিউ হচ্ছে। কাঠকয়লার আঁচে ঝলসানো হচ্ছে আস্ত মুরগি। একটু দূরে শালপাতার খসখস শব্দ। মাটির হাঁড়িতে চাল ফুটছে। টগবগ টগবগ। গরম ভাতের গন্ধে যে ঈশ্বর বাস করেন, ফুলমণিরা তা বিলক্ষণ জানেন। শালপাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, নুন আর একটা ডিম সিদ্ধ। আহ! অমৃত।