• নজর রান্নার দক্ষতায়, বিকল্প জীবিকার হদিশ দিতে সুন্দরবনে বিশেষ প্রশিক্ষণ
    প্রতিদিন | ১৭ জুন ২০২৬
  • সুন্দরবন মানেই জল, জঙ্গল আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বনাঞ্চলবাসীর পায়ে পায়ে নানা বিপদ। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে জঙ্গলের বন্যপ্রাণী আর লোকালয়ের বাসিন্দাদের যথাযথ সহাবস্থানের সুন্দর ছবি দেখিয়েছে সুন্দরবন। বাঘ, কুমিরের আতঙ্ক কাটিয়ে তাদের বন্ধু হয়ে ওঠা এখানকার মানুষের সহজাত ছিল না। দিনে দিনে বন্যপ্রাণপ্রেমীরাই তাঁদের সেই উৎসাহ আর সাহস জুগিয়েছেন। আর তাই এখন দক্ষিণরায়দের ভয় পেয়ে আক্রমণের পথে হাঁটা নয়, বরং আগলে রাখা অভ্যাস বাসিন্দাদের। তাঁদের এই সহজ সরল জীবনকে আরও একটু স্বনির্ভর করে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নিল ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংস্থা ‘শের’। মহিলাদের রন্ধনশৈলীর দক্ষতায় জোর দিয়ে বিকল্প জীবিকার সন্ধানের নতুন পথ খুলে দেওয়া হল। এতে তাঁদের বনজ সম্পদের উপর নির্ভরতাও কমবে, বছরভর আয়ের জোগানও হবে।

    গত দু’দিন ধরে ইউরো-শের সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বাঘবনে শের-এর কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারে আয়োজিত হল বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা, যার নাম ‘কমিউনিটি কালিনারি এক্সেলেন্স ইনিশিয়েটিভ’। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবন ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংলগ্ন বনপ্রান্তিক এলাকার বাসিন্দাদের রন্ধন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষিত করা। এর ফলে তাঁরা সুন্দরবনের ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।

    গত এক দশকে সুন্দরবন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণ পর্যটন স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের ক্রমাগত সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের খাবার ও রান্নার চাহিদাও বেড়েছে। পর্যটনশিল্পের এই চাহিদাকে মাথায় রেখে বিশেষত জঙ্গল প্রান্তিক এলাকার মানুষ, যাঁরা পর্যটন ক্ষেত্রে রান্নার পেশার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের জন্য এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দু’দিনের এই কর্মশালায় ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের রান্না, আধুনিক রন্ধন কৌশল, নতুন রেসিপি পরিচয়, মেনু পরিকল্পনা-সহ নানা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শেফ পিনাকী রায়। অংশগ্রহণকারীরা আধুনিক পেশাদার রন্ধনশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের রান্নার জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পান।

    এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য একটাই। সুন্দরবন ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংলগ্ন এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে মানুষের জঙ্গলের উপর নির্ভরতা কমবে। ফলে জঙ্গল বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের আরও নিরাপদ হবে, বাঘ-মানুষের সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান সুদৃঢ় হবে বলে আশা তাঁদের। ইউরো ও শের-এর উদ্দেশ্য, বিকল্প জীবিকা, পর্যটন এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ – এই তিনটি সূত্রকে একসঙ্গে জুড়লে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাস্তুতন্ত্রকেন্দ্রিক ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী করা সম্ভব। জীবিকা উন্নয়নকে সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে এই উদ্যোগ সুন্দরবনের মানুষকে বাঘ ও বন সংরক্ষণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)