• তৃণমূলের কোন শিবির বিধানসভায় ‘বিরোধী’! ‘ফ্লোর টেস্ট’ না করে সিদ্ধান্ত কীভাবে, প্রশ্ন আদালতের
    প্রতিদিন | ১৭ জুন ২০২৬
  • ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ‌্যায় নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়– কোন শিবিরের তৃণমূল বিধায়করা ‘আসল’ বিরোধী দলের মর্যাদা পাবেন! কারাই বা সেই ফয়সালা করবে! আদালত না বিধানসভার ফ্লোর! নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের দোরগোড়ায় ঝুলছে সেই প্রশ্ন।

    ঋতব্রতদের দলকে বিরোধী দলের মর্যাদা দিয়েছেন অধ‌্যক্ষ রথীন্দ্র বসু। তাঁর এই ভূমিকাকেই ‘অবৈধ’ বলে চ‌্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছে মমতা-শিবির। সেই মামলাতেই এদিন অধ‌্যক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বক্তব‌্য, “অধ‌্যক্ষ ঘরে বসে কীভাবে জানলেন বিরোধীদের কোন পক্ষে বেশি লোক আছে? অধিবেশন না ডেকে অধ‌্যক্ষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কি ক্ষমতা আছে?” অধিবেশন ডেকে এ নিয়ে ফয়সালা না করে কীভাবে তদন্ত শুরু করা হল তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এরই প্রেক্ষিতে ঋতব্রতর বক্তব‌্য, “আমরাই তৃণমূল পরিষদীয় দল। আর কে বা কারা প্রধান বিরোধী দল তা জানতে ফ্লোর টেস্ট হোক। তাতেই তো দুধ কা দুধ-পানি কা পানি হয়ে যাবে।”

    একইদিনে কলকাতা হাই কোর্টে বিরোধী দল নিয়ে মামলা আর পাশের বিধানসভা ভবনে এ নিয়ে ঋতব্রতর শিবিরকে শাসক দল বিজেপির টিপ্পনি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮ জুন বাজেট অধিবেশন বসতে চলেছে। তার আগে এদিন সর্বদলীয় কমিটির বৈঠক ও বিধানসভার কার্য উপদেষ্টা মণ্ডলীর বৈঠক বসে। সূত্রের খবর, সেখানেই হাজির ঋতব্রত-শিবিরকে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের প্রশ্ন, “আপনাদের দলের নাম কী হল তাহলে?” ঋতব্রত শেক্সপিয়রকে কোট করে জবাব দেন, “নামে কী বা আসে যায়।” পরে পরিষদীয়মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলকে মর্যাদা দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে কংগ্রেস, সিপিএম, হুমায়ুন কবীরের দল আজুপ, নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফের কথা বললেও একবারও তৃণমূল নাম উল্লেখ করেননি, মুখে আনেননি ঋতব্রতর নামও। মমতার শিবিরের তরফে কুণাল ঘোষরাও এদিন নিজেদের আসল বিরোধী দল বলে মনে করিয়ে গিয়েছেন। এই শিবিরকে অবশ‌্য এদিন সর্বদল বৈঠকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াগত গোলোযোগে আমন্ত্রণ হাতে পাননি ঋতব্রতদের শিবিরও। এদিন সকালে তা তাঁরা জোগাড় করে সর্বদল বৈঠকে যোগ দেন। তারপরই বিধানসভায় বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়ে ফ্লোর টেস্টের দাবি করেছেন ঋতব্রত।

    বিধায়কদের সই জাল-কাণ্ড ঘিরে ইতিমধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ঋতব্রতদের অভিযোগের ভিত্তিতেই সিআইডি তদন্ত করছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ‌্যায় প্রথমে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে অধ‌্যক্ষকে চিঠি লিখে বলেছিলেন তাঁদের দলের নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ‌্যায়। তাঁর নেতৃত্বের পরিষদীয় দলকেই বিরোধী দলের মর্যাদা দেওয়া হোক। এর মধ্যেই সামনে আসে সই জালের ঘটনা। ঋতব্রতরা ৫৮ বিধায়কের সই জোগাড় করে আলাদা ব্লক গড়ে অধ‌্যক্ষকে চিঠি দিয়ে জানান, তাঁরাই আসল বিরোধী দল। মমতা-শিবির মামলা করে হাই কোর্টে। যার শুনানিতে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে এদিন বিচারপতির মন্তব্য, “যেদিন বিরোধী দলনেতার নাম পাঠানো হয়েছিল সেদিন কতগুলো রাজনৈতিক দল সেখানে ছিল? যে বিরোধী দল ছিল তাদের নাম নিশ্চয়ই দেওয়া হয়েছিল। প্রধান বিরোধী দল, বিরোধী দলনেতার নাম দিলে তাকে কি অধ‌্যক্ষ অস্বীকার করতে পারেন?” আদালতে উপস্থিত রাজ্যের অতিরিক্ত অ‌্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য জানান, “অধ‌্যক্ষের কাছে নাম এলেও তাঁকে সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ বিরোধী দলের মধ্যেই দ্বন্দ ছিল।”

    এক্ষেত্রে তিনি মহারাষ্ট্রে শিবসেনা মামলার উদাহরণ টানেন। সেখানে বিরোধী দলের মধ্যে একটি নাম নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বারেবারে নাম এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার কথা তুলে বিল্বদল আরও বলেন, “আদালত সেই মামলায় বলেছে, অধ‌্যক্ষ ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হতে পারেন না। এ রাজ্যের ক্ষেত্রে এখানে যে নাম বিরোধী দলনেতা হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তাই নিয়ে বিতর্ক ছিল। তৃণমূলের তরফে যে তালিকা পাঠানো হয় সেখানে বিধায়কদের সই ছিল না, উলটে ‘ব্লক লেটারে’ নাম লেখা ছিল।” বিচারপতির প্রশ্ন, “যেদিন ওই ৬০ জনের নাম নিয়ে প্রস্তাব পেলেন অধ‌্যক্ষ, সেদিন তাঁর ভূমিকা কী ছিল? তদন্তই বা কেন হচ্ছে তা-ও স্পষ্ট নয়।” বিল্বদল বিধায়কদের সই জাল নিয়ে ঋতব্রতর অভিযোগের কথা বলে জানান, সেই নিয়ে পৃথক মামলা চলছে হাই কোর্টে। বিচারপতি বলেন, “তাহলে কি বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের প্রস্তাব পাওয়ার জন্য অধ‌্যক্ষ অপেক্ষা করছিলেন! বিরোধী দলনেতার নাম প্রস্তাব হওয়ার পরেও কী করে অধ‌্যক্ষ তা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে চুপ করে বসে থাকেন!” আইনজীবীও এর পর সই জাল নিয়ে এফআইআরের বিষয়টি জানান। বিচারপতি বলেন, “একই দলের দুটি পক্ষ যদি দুটি প্রস্তাব দেয় তাহলে অধ‌্যক্ষের তাই নিয়ে কাজ কী? আইনে কী আছে? অধ‌্যক্ষ কি স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?”

    এখানেই ঘুরে ফিরে সেই ফ্লোর টেস্টের প্রসঙ্গ আসে। বিচারপতির প্রশ্ন, “অধ‌্যক্ষ নিজের চেম্বারে বসে কী করে জানলেন কোন পক্ষে কতজন আছেন, আর কতজন কোন দিকে ভিড়ে রয়েছেন?” রাজ্য জানায়, “এখানে কোন পক্ষকে খারিজ করা হবে সেই ভূমিকা অধ‌্যক্ষের রয়েছে। তিনিই একটি শিবিরকে স্বীকৃতি দিতে পারেন।” বিচারপতি বলেন, “অধ‌্যক্ষের নির্দেশের পর সই জালের অভিযোগে তদন্ত নিয়ে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধী নেতা কে হবেন তা নিয়ে কি অধ‌্যক্ষ নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?” বুধবার এ নিয়ে ফের শুনানি।
  • Link to this news (প্রতিদিন)