• পশ্চিমবঙ্গ দিবস: মূল নথি ‘উধাও’ বিধানসভার ‍লাইব্রেরি থেকে
    এই সময় | ১৭ জুন ২০২৬
  • সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়

    কবে পালিত হবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’— এ নিয়ে তৃণমূল জমানায় তৎকালীন রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের মধ্যে বিস্তর টানাপড়েন হয়েছে। তৃণমূলের প্রস্তাবিত পয়লা বৈশাখের বদলে কেন ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করা উচিত, তা নিয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি নেতৃত্ব। বাংলায় ক্ষমতায় আসার পরেই বিজেপি সরকার জানিয়ে দিয়েছে, ২০ জুনই সরকারি ভাবে পালিত হবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’। রবিবার সেই উপলক্ষে রাজ্যে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু তার আগে রাজ্য বিধানসভায় ১৯৪৭–এর ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা রাজ্য হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রস্তাবনার ঐতিহাসিক দলিলের হদিশ মিলছে না বিধানসভার লাইব্রেরিতে!

    ১৯৪৭–এর ২০ জুন বিধানসভায় ঠিক কী আলোচনা হয়েছিল, কী ভাষণ দিয়েছিলেন সে সময়কার দেশবরেণ্য নেতারা— সেই প্রামাণ্য দলিল বছর কয়েক আগে বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে তোলা হলেও সেটা আর ফেরত আসেনি বলে সূত্রের খবর। বিষয়টি নজরে আনা হয়েছে বিধানসভার বর্তমান স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুরও। মঙ্গলবার এ নিয়ে স্পিকারের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘খোঁজ নিয়ে জানাব।’ পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘আমারও বিষয়টা জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখা হবে কোথায় গেল এই দুষ্প্রাপ্য দলিল।’

    বিধানসভা সূত্রের খবর, ২০২৩–এ ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’ কর্মসূচিতে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ নিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ তুমুল আকার নেয়। সেই সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ঠিক করে, ২০ জুন নয়, পয়লা বৈশাখকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। সূত্রের দাবি, বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে ১৯৪৭–এর প্রস্তাবনা সংক্রান্ত এই ঐতিহাসিক দলিল সম্বলিত বইটি ২০২৩–এর গোড়ার দিকে ইস্যু করা হয়েছিল। তারপরে সেই বই আর গ্রন্থাগারে ফেরত আসেনি। এমনকী, এই নথি বিধানসভার পোর্টাল lalibwb.gov.in–এও ঠাঁই পায়নি। ফলে গবেষকরাও বিধানসভার গ্রন্থাগারে রিসার্চের জন্য এই নথির খোঁজে এসে হতাশ হচ্ছেন। যেমন— ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক কৃষ্ণ সরকার মঙ্গলবারই বিধানসভার লাইব্রেরিতে এসেছিলেন ২০ জুন বিধানসভায় ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে। তিনি ‘দেশভাগ, হিন্দুদের হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ গঠন’ বিষয়ে ‘মৌলানা আবুল কালাম আজ়াদ ইনস্টিটিউট এশিয়ান স্টাডিজে়’ একটি বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তুতির জন্যই এই নথির খোঁজ করছিলেন। কিন্তু নথি না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। সূত্রের খবর, বিধানসভার স্পিকারের দপ্তরের এক আধিকারিক সোমবারই ‍লাইব্রেরি থেকে এই নথির খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে জানানো হয়, ১৯৪৭–এর সেই দস্তাবেজ সম্বলিত বইটি পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁকে শুধু ১৯৪৭–এর ২০ জুনের বিধানসভার সংশ্লিষ্ট অধিবেশনের মিনিটসটুকু খুঁজে পাঠানো হয়। এরপরেই ওই নথি মিসিংয়ের বিষয়টি নজরে আসে বিধানসভার লাইব্রেরির আধিকারিকদের। তাঁরা অবশ্য এ দিন এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

    এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল তৃণমূল জমানায় বিধানসভার অধ্যক্ষ তথা বর্তমানে বারুইপুরের জোড়াফুল বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তাঁর জবাব, ‘তাই নাকি! স্পিকারের জন্য ইস্যু হয়ে থাকলে স্পিকারের চেম্বারেই থাকার কথা। কারণ, সেখানেই সব রেখে এসেছিলাম। এখন আমার আর মনে নেই।’

    কী ছিল ১৯৪৭–এর ওই নথিতে?

    কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি— ১৯৪৭–এর ২০ জুন অখণ্ড বাংলার বিধানসভার সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলা ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা রাজ্য হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধায় এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন জ্যোতি বসু, কিরণশঙ্কর রায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, হেমন্ত বসু, সুশীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়,খগেন দাশগুপ্ত–সহ ৫৮ জন সদস্য। তাই এই বইটি থেকেই জানা যাবে, সে দিন বিধানসভায় কী আলোচনা হয়েছিল? দেশবরণ্য নেতারা ঠিক কী বলেছিলেন? দেশভাগ মেনে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নামকরণের ক্ষেত্রে কী যুক্তি ছিল?

    অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লিগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি ও তাঁর দলের সদস্যদের কী বক্তব্য ছিল? এই বইটি যেমন পাওয়া যাচ্ছে না, তেমনই বিধানসভার প্রথম দিন থেকে সমস্ত নথি ডিজিটাইজ় হওয়া পোর্টালেও নেই সেই দলিল। অথচ তার আগে ও পরে বিধানসভায় আলোচনা হওয়া সমস্ত প্রস্তাব এবং তার উপরে বিধায়কদের বক্তব্য বা বিতর্কের প্রতিটি লাইন লিপিবদ্ধ রয়েছে এই পোর্টালে। সূত্রের দাবি, শুধু এই ঐতিহাসিক দলিল নয়, বিধানসভার গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া যাচ্ছে না তৃণমূল জমানায় ইস্যু হওয়া গীতবিতান, রবীন্দ্র রচনাবলি ও নজরুল রচনাবলির সম্পূর্ণ সেট–সহ প্রায় ২৮টি বই।

  • Link to this news (এই সময়)