এই সময়: গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এবং এই শতাব্দীর প্রথম দশকের গোড়ায় বাংলার শিল্পঐতিহ্য ও বৃহত্তর ভাবে দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলার উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করতে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশেষ এক সংগ্রহ। শিল্পের জগতে এই সংগ্রহর নাম ‘গুডরিক কালেকশন’। নামটি কলকাতা ও কলকাতা চা–শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। সংগ্রহটি একই সঙ্গে ‘ক্যামেলিয়া কালেকশন’ নামেও পরিচিত। লন্ডনের প্রখ্যাত নিলামঘর ‘ক্রিস্টিজ়’–এ সম্প্রতি এই ‘গুডরিক কালেকশন’–এর ৯৩টি শিল্পসম্ভার নিলামে রেকর্ড দামে, প্রায় ১৯ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে। নিলামের আয়োজকরা জানাচ্ছেন, ৯৩টি শিল্পকাজের প্রতিটি তো বিক্রি হয়েইছে, তা ছাড়া, যতটা দামে বিক্রি হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেকটা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে বেশির ভাগই। ওই সংগ্রহের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশিষ্ট বাঙালি শিল্পী গণেশ পাইনের ২৬টি শিল্পকর্ম। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল টেম্পেরা চিত্রকর্ম, সেই সঙ্গে মিশ্র-মাধ্যমে তৈরি কাজ, ফাউন্টেন পেনে আঁকা স্কেচ এবং কাগজ বা কার্ডে বিভিন্ন নোট ও আঁকিবুকি।
প্রথম লট থেকেই নিলামের নাটকীয়তার সূচনা। লট ওয়ান–এ ছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে নিয়ে তৈরি একটি শিল্পকর্ম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরে সেটির দর উঠেছিল ৮ লক্ষ ২০ হাজার পাউন্ড। ভারতীয় মুদ্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি। এর আগে কাগজে আঁকা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনও ছবি এত বেশি দামে বিক্রি হয়নি। ‘দ্য স্পিনার অফ আ নেশন্স ডেস্টিনি’ নামে ওই ছবিতে দেখা যায়, গান্ধীর আঙুলে ধরা রয়েছে তুলোর তিনটি সূক্ষ্ম সুতো। ওই তিনটি সুতো ভারতের জাতীয় পতাকার তিনটি রঙের প্রতীক। অতি সূক্ষ্ম ভাবে আঁকা ওই সুতোগুলোই ছবির ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু— জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুতো যেন গান্ধীর হাতেই ধরা।
লট ওয়ান হইচই ফেলে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিলামে রেকর্ড গড়ে লট এইট। সেখানে ছিল গণেশ পাইনের ‘দ্য ফিশারম্যান’। ছবিটি নিলামে বিক্রি হয় ৩৮ লক্ষ পাউন্ডে। ভারতীয় মুদ্রায় ৪৮ কোটি টাকারও বেশি। ১৯৭৯–তে সালে আঁকা ওই ১৮ ইঞ্চি বাই ২২ ইঞ্চির টেম্পেরা চিত্রে দেখা যায় এক কৃশকায় মৎস্যজীবীকে। ক্রিস্টিজ়–এর বর্ণনায়, তিনি যেন ‘সময়ের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা, আত্মমগ্ন এক উপস্থিতি।’ কাঠের নৌকোয় দাঁড়িয়ে তিনি গভীর নীল জলের উপর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। গণেশ পাইনের আরও দু’টি কাজের এক–একটি প্রায় ২৪ লক্ষ পাউন্ড বা ৩০.৫ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে।
সাত বছর আগে লন্ডনে তাদের বার্ষিক দক্ষিণ এশীয় শিল্পকর্মের নিলাম ক্রিস্টিজ় বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে এ বার বিশেষ ব্যতিক্রম হিসেবে তারা ফের লন্ডনে এই নিলামের আয়োজন করে বিশেষ ভাবে ক্যামেলিয়া কালেকশন–এর জন্যই। তারই পরিণতি এই বিপুল সাফল্য। নিলামের দায়িত্বে থাকা ক্রিস্টিজ়–এর বিশেষজ্ঞ ড্যামিয়েন ভেসে যে সাফল্যকে ‘সাবলাইম’ বা ‘অতুলনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
শিল্পরসিকদের অনেকের বক্তব্য, গণেশ পাইন ছিলেন একান্ত নির্জনচারী ও আধুনিকতাবাদী একজন শিল্পী। তাঁর শিল্পে বেঙ্গল স্কুলের ঐতিহ্যের প্রভাবের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল অলৌকিকতা, পুরাণ, বাংলা লোককথা এবং এক ধরনের কাব্যিক পরাবাস্তবতা। তাঁর বহু ছবিতেই এক ধরনের বিষণ্ণ ও অন্ধকার আবহ দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, ১৯৪৬–এর কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও গণহত্যার অভিজ্ঞতা তাঁর মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তখন তিনি ৯ বছরের।