• কাটমানিতে কোপ অবলা পশুর খাবারেও! তদন্তের পথে বনমন্ত্রী
    এই সময় | ১৭ জুন ২০২৬
  • এই সময়, আলিপুরদুয়ার: খাবারে টান পড়লে চিড়িয়াখানার খাঁচার ভিতর থেকে ওরা বড়জোর গরগর করতে পারে। ডেমোক্র্যাসি বা 'ডিমোক্র্যাসি' — প্রতিবাদ জানানোর এ সব চেনা পথ তো ওদের নয়। ভাষা বুঝবে কারা? ঠিক সেটারই সুযোগ নিয়েছিল কেউ কেউ!

    শুধু আবাস যোজনা, সড়ক নির্মাণ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কাটমানির অভিযোগ নয়। রাজ্যের ১২টি চিড়িয়াখানা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের আবাসিক মাংসাশী বন্যপ্রাণীদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলে বড়সড় দুর্নীতির আভাস দিলেন নতুন বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাঁও। বাঘ–সিংহের খাবারের জন্য বরাদ্দ টাকায় বিপুল গরমিলের কথা জানিয়ে কুমারগ্রামের বিধায়ক মনোজের মন্তব্য, 'তদন্ত তো হবেই। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ ও নির্দেশ মেনে তার রূপরেখা ঠিক করা হবে।'

    টাকার নয়ছয় রুখতে ইতিমধ্যেই গোটা বিষয়টিতে মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছেন বনমন্ত্রী। তার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরার মাধ্যমে সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম তৈরি করতে বলা হয়েছে রাজ্যের বনকর্তাদের। ওই কন্ট্রোল রুম তৈরি হবে বন দপ্তরের মুখ্য কার্যালয়— সল্টলেকের অরণ্য ভবনে। সেখানে বসে বিভাগীয় মন্ত্রী–সহ শীর্ষ বনকর্তারা আবাসিক বন্যপ্রাণীদের দৈনিক মাংসের পরিমাণ, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের ব্যবহার, সঠিক পরিচর্যার বিষয়গুলি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট চিড়িয়াখানার রেকর্ড বুকের লিখিত নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন।

    এই মুহূর্তে রাজ্যের ১২টি চিড়িয়াখানায় সিংহ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, লেপার্ড ও স্নো লেপার্ড মিলিয়ে একশোর বেশি মাংসাশী প্রাণী রয়েছে। বন দপ্তরের নথি অনুসারে, ওই আবাসিক প্রাণীদের খাবারের জন্য বছরে বরাদ্দ করা হয় কয়েক কোটি টাকা। তবে এক্ষেত্রে খরচের হিসেব সব সময়ে নির্দিষ্ট করা যায় না। কারণ মাংসের জোগান ও বাজারদর ওঠা–নামা করে। তাই দৈনিক নির্দিষ্ট অর্থবরাদ্দে বাঘ–সিংহের পেট ভরানো সম্ভব নয়। যেমন হালে গরু ও মোষের মাংসের জোগান কমে যাওয়ায় ছাগল ও শুয়োরের মাংস দিয়ে 'রেড মিট'–এর চাহিদা পূরণ করতে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে বন দপ্তরকে।

    একে বাঘ–সিংহ বলতে পারে না, খাবার পর্যাপ্ত পাচ্ছে কি না। তায় আবার দৈনিক অর্থবরাদ্দ নির্দিষ্ট নয়। অভিযোগ, এগুলোর সুযোগ নিয়েই টাকা নয়ছয় হয়েছে গত কয়েক বছরে। বনমন্ত্রী মনোজের অভিযোগ, 'আমার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে, সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বাদে, বাকি ছ'দিন চিড়িয়াখানাগুলির আবাসিক বন্যপ্রাণীদের দৈনিক যে পরিমাণ মাংস পাওয়ার কথা, সেখানে তাদের তা দেওয়া হচ্ছে না। বরং সারা বছরে ওই বরাদ্দে কাটছাঁট করে বিগত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।' বাঘ–সিংহের মুখের গ্রাস কেড়ে 'অাঙুল ফুলে কলাগাছ' হয়েছে অনেকেরই।

    সেই কারণেই কি সেন্ট্রাল মনিটরিং? মনোজের কথায়, 'এক দিকে ওই বিপুল আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত যেমন করা হবে, অন্যদিকে টাকার অপচয় রুখতে কড়া পর্যবেক্ষণের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হবে। কারণ শুধু মনিটরিং কমিটি গড়ে কোনও লাভ হবে না। বরং ওই কমিটিগুলিই কয়েক দিনের মধ্যে ঘুঘুর বাসায় পরিণত হবে।' তবে শুধু চিড়িয়াখানাই নয়, রাজ্যে বন দপ্তরের সব টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে হস্তিশালায় অর্থের নয়ছয় রুখতেও একই টোটকা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন বনমন্ত্রী।

    বন দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশের এটাও বক্তব্য যে, এই ধরনের দুর্নীতি বা নয়ছয়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চিড়িয়াখানায় উপস্থিত কর্মীদের কেউ কেউ যুক্ত মনে করলে পুরো চক্রটা সামনে আসা কঠিন। কারণ প্রতি চিড়িয়াখানার প্রাণীর সংখ্যা এবং বয়স অনুযায়ী খাবারের অর্থবরাদ্দ এবং তার হিসাব রাখার দায়িত্ব শুধু চিড়িয়াখানার আধিকারিকের নয়। তারা তথ্য পাঠায় রাজ্য জ়ু অথরিটিকে, সেখান থেকে যাবতীয় তথ্য যায় রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপালের দপ্তরে। সেখান থেকেই রাজ্যের চিড়িয়াখানা সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন মতো আদানপ্রদান করা হয় জাতীয় স্তরে — সেন্ট্রাল জ়ু অথরিটির সঙ্গে। ফলে রাজ্যের সব চিড়িয়াখানাতেই যদি মাংসের জন্য বরাদ্দ অর্থ নিয়ে নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠে, তা হলে 'সর্ষের মধ্যে ভূত' খোঁজার কাজেও সম্ভবত নামতে হবে বন দপ্তরকে — মনে করছেন কর্মীদের একাংশ।

  • Link to this news (এই সময়)