পাহাড়ের উন্নয়নে একগুচ্ছ ঘোষণা শুভেন্দুর, জিটিএ দুর্নীতির তদন্ত ও কর্মসংস্থানের আশ্বাস
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৭ জুন ২০২৬
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর উত্তরবঙ্গ সফরে গেলেও শিলিগুড়ি পর্যন্ত তা সীমিত ছিল। তবে মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো কার্শিয়াং সফরে গিয়ে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের একাধিক প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন কার্শিয়াংয়ের মন্টেভিট গ্রাউন্ডে আয়োজিত জনসভা ও পরবর্তী সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি পাহাড়ের জন্য নতুন উন্নয়ন রূপরেখা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে জিটিএ-তে দুর্নীতি, আগের সরকারের তোলাবাজি ও কাটমানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তাও দেন।
এদিন সকালে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছে সড়কপথে কার্শিয়াং যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন, সাংসদ রাজু বিস্তা, হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, বিধায়ক সোনম লামা, নোমান রাই, ভরত ছেত্রী, দুর্গা মুর্মু-সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা। উপস্থিত ছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং, রোশন গিরি, জিএনএলএফ সভাপতি মন ঘিসিং এবং বিজেপি হিল সভাপতি সঞ্জীব লামাও।
পাহাড়বাসীর উদ্দেশে শুভেন্দু বলেন, তিনি পর্যটনের জন্য নয়, উন্নয়নের কাজ নিয়েই পাহাড়ে আসবেন। পশ্চিমবঙ্গের বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ থেকে ভালো ফল করে এসেছে বিজেপি। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, ‘২০০৯ সাল থেকে বার বার পাহাড়ে পদ্ম ফুটেছে। পাহাড়বাসী সব সময়েই বিজেপির উপর ভরসা রেখেছে। সেই ভরসা, প্রত্যাশা পূরণের সময় এসেছে।’ তাঁর কথায়, পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের লক্ষ্য। কেন্দ্রের সমস্ত প্রকল্প পাহাড়ে বাস্তবায়িত হবে এবং ডবল ইঞ্জিন সরকার পাহাড়কে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনবে।
চা শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২১ সালে চালু হওয়া ‘পিএম চা শ্রমিক যোজনা’ আগের সরকারের আমলে কার্যকর হয়নি। বর্তমানে বন্ধ থাকা ২৫টি চা বাগানের জন্য ৩৩৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত শুরু করা হচ্ছে। পাশাপাশি টি-বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে চা বাগানের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, তৃণমূল আমলে পাহাড়কে সবসময় বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তাঁর কথায়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের উন্নয়ন নিয়ে সেভাবে ভাবতেন না। আগের মুখ্যমন্ত্রী এখানে ঘুরতে আসতেন।
জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কাউকে রেয়াত করা হবে না। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘যারা লুঠপাট করেছে, তাদের জেলে যেতে হবে।’ একইসঙ্গে গোর্খা আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন তিনি। আন্দোলনে প্রাণ হারানো পরিবারগুলিকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।
উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পাহাড়ের ২৮ লক্ষ মহিলাকে ‘অন্নপূর্ণা যোজনার’ আওতায় মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কালিম্পঙে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, কার্শিয়াং হাসপাতালের সংস্কার, সরকারি স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম নির্মাণ এবং ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইনডোর স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস গ্রাউন্ড তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এদিন কার্শিয়াংয়ের মন্টেভিট ময়দানে জনসভার পর স্থানীয় গোথেলস স্কুল গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক জনকল্যাণ শিবিরে যোগ দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই শিবির থেকে ৩০ জন উপভোক্তার হাতে বিভিন্ন সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা তুলে দেন তিনি। এরপর স্কুল গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের ঘোষণা করেন।
উপভোক্তাদের উদ্দেশে ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের মোট ৫৪টি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা কোনো প্রকার দুর্নীতি ছাড়াই সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, পাহাড়কে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে ডবল ইঞ্জিন সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।
পাহাড়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস (ইএফআর) পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা করে শুভেন্দু জানান, ইএফআর এবং রাজ্য পুলিশে নতুন করে ১,০০০ জন গোর্খা যুবক-যুবতীকে নিয়োগ করা হবে। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণও থাকবে। এছাড়া আগামী এক মাসের মধ্যে পুলিশ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি জানান।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে ১ জুলাই থেকে ১২৫ দিনের কাজ চালু হবে। জাতীয় সড়ক, সংযোগ রাস্তা এবং জিটিএ এলাকার অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি নতুন পর্যটন কেন্দ্র, রোপওয়ে, নার্সারি এবং জল প্রকল্প গড়ে তোলা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে বাড়ি নির্মাণের জন্য ৩ লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও করেন তিনি।
সবশেষে পাহাড়কে বাংলার প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার আখ্যা দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘ভয়ের সংস্কৃতি শেষ হয়েছে। এবার পাহাড় পাবে ভরসার সরকার। কর্মসংস্থান, উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের মাধ্যমে পাহাড়ের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে।’