বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম
মরশুমি ফল আম, জাম, কাঁঠাল নিবেদন করা হয়। অনেক সময়ে আবার দেওয়া হয় পাঁঠা, হাঁস–মুরগিও। ভালো ফসলের জন্য বৃষ্টির কামনায় এ ভাবেই পাহাড় পুজোর আয়োজন করেন জঙ্গলমহলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন। এই পুজো যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। বাংলার আষাঢ় মাসের নির্দিষ্ট শনিবার ধরে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির পাহাড়গুলিকে পুজো করা হয়। এ বার এই পাহাড় পুজো দেখতে বহু পর্যটনও আসছেন বলে জানিয়েছেন হোটেল মালিকরা। পর্যটনের মরশুম কেটে যাওয়ার পরে ঝাড়গ্রামে পর্যটন ব্যবসায় একটা খরা দেখা দেয়। যদিও ছুটির দিনগুলিতে ভালোই পর্যটক আসে ঝাড়গ্রামে। কিন্তু এ বার পাহাড় পুজো দেখতে পর্যটনরা আসছেন।
ঝাড়গ্রাম ডিস্ট্রিক্ট হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘পাহাড় পুজোর আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। শনি ও রবিবার ছুটির দিনগুলিতে পর্যটকের ভালো ভিড় হয়। শনিবার ধরে পাহাড় পুজো থাকায় বেড়ানোর সঙ্গে পাহাড় পুজো দেখায় জন্য পর্যটকদের ভালোই উৎসাহ রয়েছে। পাহাড় পুজোর দিনগুলিতে ভালোই বুকিং শুরু হয়েছে।’ জুন ও জুলাই মাসের শনিবারগুলিতে পাহাড় পুজো হয়। জানা গিয়েছে, ২০ জুন বেলপাহাড়ির ন্যাকড়া পাহাড়ি ডুংরি নামের ছোট একটি পাহাড়কে পুজো করার মধ্য দিনে শুরু হচ্ছে পাহাড় পুজো। ২৭ জুন রয়েছে গাড়রাশিনি পাহাড় পুজো। ৪ জুলাই রয়েছে বেলপাহাড়ির সর্বোচ্চ উঁচু পাহাড় কানাইশ্বর পাহাড়ের পুজো। পরের দিন ৫ জুলাই কানাইশ্বর পাহাড়ের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অংশে পুজো রয়েছে। ১৮ জুলাই বেলপাহাড়ির হাতিমারা পাহাড়ের পুজো দিয়ে পাহাড় পুজো শেষ হয়। এর মাঝে বেলপাহাড়ি লাগুয়া ঝাড়খণ্ড রাজ্যের চাকুলিয়া ও বহড়াগোড়ার পাহাড়গুলোর শনি ও মঙ্গলবার পুজো হয়। পাহাড় পুজোকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের নীচে মেলাও বসে। কানাইশ্বর পাহাড় পুজোর মেলায় ঝাড়খণ্ড, ওডিশা থেকেও ব্যবসায়ীরা আসেন। ভিড়ও হয় চোখে পড়ার মতো। পশ্চিম মেদিনীপুরের বাসিন্দা লোকসংস্কৃতিক গবেষক মধুব দে বলেন, ‘আদিম যুগ থেকে মানুষ পাথর-বৃক্ষ এবং পাহাড়কে শক্তিরূপে পুজো করে আসছেন। তাঁদের বিশ্বাস, পাহাড় দেবতাকে তুষ্ট করতে পারলেই ভালো বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হলে ভালো ফসলও হবে। পাহাড় পুজোয় শুধু মূলবাসী, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন নয় পাহাড়ের আশেপাশে বসবাসকারী সমস্ত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই পুজো করেন।’
বর্ষার সময়ে বেলপাহাড়ির এক অন্য রূপ দেখা যায়। জেগে উঠে বেলপাহাড়ির সুপ্ত জলপ্রপাতগুলি। জানা গিয়েছে, ঘাগরা, হুদহোদি, গাড়রাশিনি, হাতিপাথরের মতো জলপ্রপাতগুলি জেগে ওঠে। যা পর্যটকের কাছে বাড়তি পাওনা। তার সঙ্গে পাহাড় পুজো দেখতে পান পর্যটকরা। পাহাড় পুজোর সময়ে বৃষ্টি হলে পাহাড়ে উঠতে সমস্যার মুখে পড়তে হয় পাহাড় পুজো দেখতে আসা দর্শনার্থীদের। পাহাড়ে ওঠা সহজ করতে কানাইশ্বর পাহাড়ের ঝাড়খণ্ডের অংশে ঝাড়খণ্ড সরকারের পক্ষ থেকে কংক্রিটের সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। বেলপাহাড়ি ট্যুরিজ়ম অ্যাসোসিয়েশন মুখপাত্র বিধান দেবনাথ বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে পাহাড় পুজোর টানে বেলপাহাড়িতে পর্যটকের ঢল নামছে। পাহাড় পুজোর তারিখগুলিতে ভালো বুকিং শুরু হয়েছে। পাহাড় পুজো দেখার পাশাপাশি বর্ষার সময়ে বেলপাহাড়ির সুপ্তপ্রায় জলপ্রপাতগুলি জেগে উঠেছে। সব মিলিয়ে আনন্দও উপভোগ করেন পর্যটকরা। আর ঝাড়গ্রামের ব্যবসারও উন্নতি হয়।’