তিনি জগন্নাথ। বড় নিজের লোক। বড় আপন। তাঁর কাছে মনের সুখ-দুঃখের কথা বলা যায়। দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলা যায়। আবার রাগ-অভিমানও করা যায় অক্লেশে। তার পরে কোনও এক দিব্য মুহূর্তে তিনি ধরাধামে অবতীর্ণ হন। চরাচর ভেসে যায় জ্যোতির্পুঞ্জে। আকুল নয়নে কেঁদে ওঠেন ভক্ত, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে।’
ভক্ত মন্দির গড়ে। ভক্তই শত কষ্ট, বাধা অতিক্রম করে যাত্রা করে ‘ধাম’-এ। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান বলে মানুষের বিশ্বাস। তবু কোনও কোনও স্থানের প্রতি ভক্তের আলাদা টান থাকে। কারণ, বিশ্বাস বলে সেখানে ঈশ্বর লীলা করেছেন। তাঁর পায়ের ধুলো লেগে রয়েছে পথে, তাঁর স্পর্শ রয়েছে বাতাসে-প্রকৃতিতে। এটাই বোধহয় স্থান মাহাত্ম্য। প্রচলিত ধারণা, এখানে এলে তাঁকে ছোঁয়া যায়, অনুভব করা যায়।
দিঘার নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে ‘ধাম’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির শত আপত্তি অনুরোধেও তাঁর মন টলেনি। রাজ্যে পালাবদলের পরে মোহনচরণের অনুরোধকে মান্যতা দিয়ে ‘ধাম’ শব্দ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীশ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। তবে রীতিনীতিতে কোনও প্রভাব পড়বে না বলেই মত শাসক দলের রাজনীতিকদের। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গেই জগন্নাথ দেবের পুজো চলবে, ভজন-কীর্তনও।
ধাম হোক অথবা মন্দির, তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে কোনও দড়ি টানাটানি নেই। বরং, ধর্মীয় বিশ্বাসের টানে ভক্তরা মন্দিরে গিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো দেন। আর ধামে গিয়েও ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জানান ভক্তরা। তাই, ছুটি পেলেই পরিবার নিয়ে বাঙালি পুরী ধামে গিয়ে দু’দিন কাটিয়ে আসে। আর এখন দিঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পরে সেখানে সারা বছর পর্যটকদের ভিড়। মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য সকাল, বিকেল লাইন পড়ছে ভক্তদের। দিঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওল্ড এবং নিউ দিঘা মিলে মোট ৮০০টি হোটেল রয়েছে। সাধারণত, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দিঘায় পিক সিজ়ন। কিন্তু, জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পরে পুরো চিত্রটাই বদলে গিয়েছে। সারা বছর দিঘায় পর্যটকদের ভিড় লেগেই রয়েছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে হোটেল ভাড়া বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ।
উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুরের বাসিন্দা অমিত ঘোষ সপরিবার জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দিঘা ঘুরতে গিয়েছিলেন। নিউ দিঘার একটি হোটেলে তিনি ছিলেন। যদিও এই সময়ে দিঘায় পিক সিজ়ন। অমিত বলেন, ‘আমি যে হোটেলে ছিলাম, তার ভাড়া অন্য সময়ে ১৫০০-১৭০০ টাকা। পিক সিজ়ন বলে আমাকে ২৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।’ তাঁর দাবি, মন্দির হওয়ার পরেই সারা বছর ভক্তদের ভিড় লেগে রয়েছে। ফলে, দিঘায় এখন আলাদা করে ‘পিক সিজ়ন’ বলে কিছু নেই।
দিঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক বিপ্রদাস চক্রবর্তী এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পরে দিঘার অর্থনৈতিক চিত্রটাই একেবারে বদলে গিয়েছে। এখন সারা বছরই পর্যটক থাকছে, যা আগে ভাবা যেত না।’ তাঁর দাবি, মন্দির গড়ে ওঠার আগে বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ পর্যটক দিঘায় আসতেন। এখন তা বেড়ে প্রায় ৮০ লক্ষ হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিটি হোটেলের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আয় বৃদ্ধিও হয়েছে। তাঁর আরও বক্তব্য, ‘দিঘার নিকাশি ব্যবস্থার দিকে সরকারের নজর দেওয়া দরকার। সেটা বাস্তবায়িত হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। দিঘায় এসে পর্যটকরা নির্ভেজাল ছুটি কাটাতে চান। ভক্তিভরে জগন্নাথ মন্দিরে তাঁরা পুজো দেন। মন্দির না ধাম, তা নিয়ে ভক্তরা মাথা ঘামাতে চান না।’
মন্দির আর ধাম নিয়ে যখন চর্চা হচ্ছে, তখন জেনে নেওয়া দরকার দেশে কতগুলি ধাম রয়েছে। সনাতন পরম্পরায় বিষ্ণুর চারটি ধামের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। দেশের চার দিকে অবস্থিত এই চার ধাম সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি — এই চার যুগের প্রতিনিধিত্ব করে।
উত্তরে হিমালয়ের কোলে বদ্রীনাথ— অলকানন্দা নদীর তীরে বিষ্ণু এখানে বদ্রী নারায়ণ রূপে বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস। পৌরাণিক কাহিনি মতে, এখানে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু। বিশ্বাস, সত্যযুগে এই ধাম-মাহাত্ম্যের সূচনা।
দক্ষিণে সাগরবেষ্টিত রামেশ্বরম— ত্রেতাযুগের স্মারক। লোকবিশ্বাস, লঙ্কা অভিযানের আগে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র এখানেই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে মহাদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন।
পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকা— শ্রীকৃষ্ণের রাজ্য, তাঁর লীলাভূমি। দ্বাপর যুগের প্রতিনিধিত্ব করে।
পূর্বে নীলাচলের জগন্নাথপুরী— কলিযুগের ধাম। পুরাণের কাহিনি ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এখানেই জগন্নাথ রূপে শ্রীকৃষ্ণ বিরাজ করছেন ভ্রাতা বলরাম আর ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে।
ধর্ম যেমন ধারণ করে, ‘ধাম’-ও তেমন। এখানে ঈশ্বর স্বয়ং অধিষ্ঠান করেন বলে বিশ্বাস, পুরাণ-কথন। তাঁর পূর্ণাবতার বা লীলাবতারের আবির্ভাব হলেও সেই স্থান ধাম হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে নিত্যপুজো হয়, শুদ্ধভক্তরা আসেন। ভগবত পাঠ হয়। এর সঙ্গে মন্দিরের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই মনে করেন শাস্ত্রজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি। তাঁর কথায়, ‘ধাম মানে জায়গা, স্থান। আবার জ্যোতিও। যাকে আমরা তেজঃপুঞ্জ বলি। এর মধ্যে মন্দিরও থাকতে পারে, আবার অন্য কিছুও।’ এ প্রসঙ্গে নবদ্বীপধামের উদাহরণ টানলেন তিনি, ‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়েছিল নবদ্বীপে। তাই ধাম। কারণ সেখানে জ্যোতিঃস্বরূপ ব্রহ্ম রয়েছেন। তাই ওই বিশেষ স্থানটি ধাম।’
আগম শাস্ত্রে মন্দির নির্মাণের জন্য আয়তাকার বা বর্গাকার জমি তৈরির কথা রয়েছে। আবার যে জমির পশ্চিম, দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে পাহাড় বা উচ্চভূমি থাকে, সেই জমি আদর্শ। উত্তর, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বমুখে প্রবাহিত নদীর পাশের জমিকেও উত্তম বলা হয়েছে। মন্দিরের দ্বার হবে পূর্ব বা উত্তরমুখী। স্থাপনের পরে বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে। ভক্তরা আসবেন। তবে এই স্থানের সঙ্গে ঈশ্বরের লীলার কোনও সম্পর্ক নেই।
ঋগ্বেদে ‘ধাম’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে বলে জানালেন গবেষক বিজলীরাজ পাত্র। তাঁর কথায়, ‘ধাম এসেছে ‘ধামানি’ শব্দ থেকে। ঋক বেদে আমরা এই শব্দটি পাচ্ছি। বঙ্গীয় শব্দকোষে এই নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’ তবে চারটি স্থানের মধ্যে ‘ধাম’-কে বেঁধে রাখতে চান না তিনি। বিজলীরাজের কথায়, ‘এর ফলে অন্যান্য সম্প্রদায় ক্ষুণ্ণ হতে পারে।’ আঠারো শতকের শেষের দিকে ‘ধাম’ শব্দের উদ্ভব হয় বলেও দাবি তাঁর।
রবীন্দ্রভারতীর সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সোমা বসুর কথায়, ‘ধামের অর্থ আবাস। যখন কোনও স্থান দেবতার ধাম হিসেবে চিহ্নিত হয়, তার সেই স্থানে দেবতা স্বয়ং বিরাজ করেন, সেখানকার জল-বাতাস-ধুলো-মাটি সবেতেই তিনি জড়িয়ে। জগন্নাথদেব পুরীর জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই পুরীর জগন্নাথ মন্দির জগন্নাথ ধামের মর্যাদা পেয়েছে।’
তবে ভক্তের আকুলতায় তত্ত্বের কচকচানি চলে না। সে মন্দিরে ছুটে যায়, আবার ধামেও। কখনও বাৎসল্য রসে প্লাবিত হয় তার মন। কখনও বন্ধু ভাবে। ‘দেখা দাও’, এটুকুই তার চাওয়া। তাঁর উপস্থিতিটাই সব। একবার তাঁকে অনুভব করতে পারলেই জীবন ধন্য। ভক্ত কখনও প্রহ্লাদ, কখনও মীরা। পথে পথে খুঁজে ফেরে তাঁকে। কান পেতে বুকে টেনে নেয় সেই গান, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।’