আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০ জুন তারিখটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে তুলে ধরা এবং সরকারিভাবে উদযাপন করা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিতর্ক এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। ১৯৪৭ সালের এই বিশেষ দিনটিতেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় এক ঐতিহাসিক ভোটাভুটির মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলা প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়েছিল। এই ভোটাভুটির ফলেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে আজকের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয় এবং মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ইতিহাসের এই অমোঘ সন্ধিক্ষণকে কেন্দ্র করে বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর দাবি, ২০ জুনের সিদ্ধান্তই ভারতকে এক টুকরো বাংলা উপহার দিয়েছিল, যার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বিজেপি নেতৃত্বের মতে, ১৯৪৬ সালের ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ এবং নোয়াখালির দাঙ্গার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে এবং একটি স্বতন্ত্র স্বভূমি গড়ে তুলতে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই কারণেই এই দিনটিকে গৌরবময় ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা দিবস’ হিসেবে রাজ্যজুড়ে মহাসমারোহে পালন করার পক্ষে সওয়াল করছে তারা।
অন্যদিকে, এই উদযাপনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের যুক্তি, ২০ জুন কোনও উৎসব বা আনন্দের দিন হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও বঙ্গভঙ্গের সেই অধ্যায়টি বাঙালির ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, ঘরবাড়ি হারানো এবং রক্তক্ষয়ী যন্ত্রণার স্মৃতি বহন করে। এই যন্ত্রণার ইতিহাসকে ‘দিবস’ হিসেবে উদযাপন করার মানসিকতার বিরোধিতা করে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজভবনে এই অনুষ্ঠান না করার জন্য অনুরোধও জানিয়েছিলেন এবং এর বিকল্প হিসেবে বাঙালি সংস্কৃতির মিলন উৎসব ‘১ বৈশাখ’ বা পয়লা বৈশাখ দিনটিকে ‘বাংলা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যেও এই দিনটির মূল্যায়ন নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সুগত বসুর মতো একাংশের মতে, ২০ জুনের ভোটাভুটি ছিল মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার অধীনে দেশভাগের সিদ্ধান্তে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সিলমোহর মাত্র। একে আলাদা করে উদযাপন করার মতো কোনও ঐতিহাসিক কারণ নেই, বরং এটি ‘আত্মঘাতী বাঙালির লজ্জার দিন’। অধ্যাপক বসু আরও মনে করিয়ে দেন যে, সেই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ চন্দ্র বসু এবং কিরণ শঙ্কর রায়রা বাংলাকে ভাগ না করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘যুক্তবঙ্গ’ (ইউনাইটেড বেঙ্গল প্ল্যান) গঠনের চেষ্টা করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
এর বিপরীতে, ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতির মতো আরএসএস ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিকদের দাবি, সেদিন যদি বাংলা ভাগের এই সিদ্ধান্ত না নেওয়া হতো, তবে হয়তো পুরো বাংলা জেলাই পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত এবং ভারতের মানচিত্র থেকে পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্বই মুছে যেত। ফলে অন্ধকার সময়ের দাঙ্গা থেকে পরিত্রাণ ও নতুন রাজ্য গঠনের প্রেক্ষাপট হিসেবে এই দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
ইতিহাসের এই দ্বিমুখী স্রোত আর রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্য দিয়েই প্রতি বছর ২০ জুন তারিখটি এলেই পশ্চিমবঙ্গের আত্মপ্রকাশের ইতিহাস এবং তার উদযাপনকে ঘিরে বিতর্ক বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।