• ২৭ বছর পর মায়ের মুখোমুখি মাও কমান্ডার শকুন্তলা! ভুলে যেতে চান পুষ্পা নাম
    প্রতিদিন | ১৮ জুন ২০২৬
  • প্রায় ২৭ বছর পর মা-মেয়ে মুখোমুখি! এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। ১০ বছরের বালিকা এখন ৩৭ বছরের তরুণী। স্কোয়াডে কমরেড ম্যারেজ হয়েও গুলিতে মৃত স্বামী। আর অন্যদিকে প্রায় ৬০ বছর বয়স্ক মা বড় মেয়ের জন্য চিন্তায় শুকিয়ে কাঠ। মায়ের শরীরে বাসা বেঁধেছে অপুষ্টি। সেই সঙ্গে ব্রেন টিউমার। তাই অসুস্থ মা আর পরিবারের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাড়খন্ডের সারান্ডার স্কোয়াড থেকে পালিয়ে এলেন শকুন্তলা মাহাতো। জঙ্গল জীবন ছেড়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে নিজের আগ্নেয়াস্ত্র ইনসাস বুধবার পুলিশ প্রশাসনের হাতে তুলে দেন মাও নেত্রী। সিপিআই (মাওবাদী) বঙ্গ ব্রিগেডের জোনাল কমিটির সদস্য, মাও কমান্ডার পরী, বর্ষা, পুষ্পা স্কোয়াডের এইসব নাম ভুলে ঘরের মেয়ে ‘লুটুন’ নামেই বাকি জীবনটা কাটাতে চান শকুন্তলা। ভুলে যেতে চান তাঁর জীবনের ২৭টা বছর। তাই সর্বক্ষণের সঙ্গী ইনসাস পুলিশ প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়ে শকুন্তলা জানান, “নতুন সরকারের আমলে সমাজের মূল স্রোতে বাঁচতে চাই।”

    ১৯৯৯ সালে কাকু যুধিষ্ঠির মাহাতো ওরফে অর্জুনের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলেন। সমাজ বদলানোর স্বপ্নে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুক। সেই কাকু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ২০১২ সালে। ঘরে ফিরেছিল তাঁর লাশ। তাই দীর্ঘদিন ধরেই উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ আর আতঙ্কে দিন কাটছিল ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির মেছুয়া গ্রামের এই কুড়মি পরিবারের। ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার মেঘাবুরুর জঙ্গলে একসঙ্গে ১৭ জন মাওবাদী নেতা-নেত্রী থেকে সাধারণ স্কোয়াড সদস্য মারা যাওয়ায় কেঁপে গিয়েছিল এই পরিবার। শকুন্তলার পরিণতিও যেন তাঁর কাকুর মতো না হয়, তাই মেয়ের কাছে হাত জোড় করে পরিবারের আবেদন ছিল, “ফিরে আই লুটুন, ফিরে আয় শকুন্তলা।”

    পরিবারের এই আর্জি আর ফেরাতে পারেননি শকুন্তলা। বাড়িতে ফিরে মায়ের সঙ্গে দেখা করে ২ ঘণ্টা কাটিয়ে আত্মসমর্পণ করতে গ্রাম ছাড়েন তিনি। আত্মসমর্পণের এই প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন একদা মাও শীর্ষ নেতা তথা শকুন্তলার এক সময়ের সহযোদ্ধা রঞ্জিত পাল। ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি স্ত্রী’কে নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র-সহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এর ৯ বছর পর বাংলায় কোনও মাও নেত্রী ইনসাস নিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরলেন। এই নিয়ে শকুন্তলার ভাই অমিয় মাহাতো বলেন, “রঞ্জিতদা দিদির একসময়ের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাই দিদি বাড়ি ফেরার পর পরিবারের তরফে আত্মসমর্পণের জন্য আমরা তাঁর হাতেই সব দায়িত্ব দিয়েছিলাম।” মেজো বোন পূর্ণিমা মাহাতোর কথায়, “দিদি বাড়ি ফেরার পর মাকে আর আমাকে জড়িয়ে ধরে শুধু কেঁদেছে। আমাদের কথা শুনে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা যে কত খুশি বোঝাতে পারব না। দিদি এখন গ্রামের বাড়িতে মা’র কাছে থাকুক, আমরা এটাই চাই।” মা মেথিলা মাহাতো বলেন, “মেয়েটাকে যে এই জীবনে দেখতে পাবো সেটাই ভাবতে পারিনি। কত বদলে গিয়েছে। ওকে একটা কথাই বলেছি, আর আমার চোখের আড়াল হবি না।” শকুন্তলা বলেন, ‘‘মূলস্রোতে ফিরে আসতে পেরে ভালো লাগছে। মাওবাদী আন্দোলনের গুরুত্ব কমে গিয়েছে। আমার মতো অন্যরাও আত্মসমর্পণ করুন।’’

    জঙ্গলে গিয়ে বন্দুক হাতে তোলার পর বাড়ির বাইরে একবারই তাঁর দিনমজুর বাবা লক্ষ্মীকান্ত মাহাতোর সঙ্গে দেখা করেছিলেন শকুন্তলা। কেন্দ্রের মাওবাদী শূন্য ভারত গড়ার ডেডলাইনের পর ঘরের মেয়ে লুটুন যে অক্ষত রয়েছেন এটাই বড় প্রাপ্তি মেছুয়া গ্রামের। এবার শকুন্তলার হাত ধরে কি মাও বঙ্গ ব্রিগেডের আরও বড় মাথা মূলস্রোতে ফেরার পথে? এই কথাই প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে ঝুলছে বনমহলে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)