• বিনা পুনর্বাসনে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পথে মমতা, ধর্মতলার মানববন্ধনে নেই চেনা সঙ্গীরা
    eTV Bharat | ১৭ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 17 জুন: ​রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে নবান্ন । মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে রেলের জমি থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের বেহাত হওয়া বিভিন্ন এলাকা জবরদখল মুক্ত করতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সক্রিয়তা দেখাতে শুরু করেছে পুলিশ ও প্রশাসন । কিন্তু কোনও রকম পূর্বপরিকল্পনা বা বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না-করে এই বুলডোজার অভিযানের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি রাজপথে অবতীর্ণ হলেন তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

    বুধবার কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় তাঁর নেতৃত্বে আয়োজিত হল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ মিছিল । গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে এদিন গরিব হকারদের রুটিরুজি বাঁচানোর দাবিতে সরব হন তৃণমূল নেত্রী । ​দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার বিকেল গড়ালেই ধর্মতলা চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা । এরপরই সেখানে উপস্থিত হয়ে সরাসরি এই আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । এদিন তাঁর সঙ্গে এই মিছিলে পা মেলাতে দেখা যায় কুণাল ঘোষ এবং দোলা সেনের মতো প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কয়েকজন নেতা-নেত্রীকে ।

    বিক্ষোভ মঞ্চ থেকে বর্তমান রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে জানানো হয়, "কোনও রকম বিকল্প আয়ের উৎস বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না-করে এভাবে হাজার হাজার গরিব মানুষের দোকানপাট ভেঙে দেওয়া অত্যন্ত অমানবিক এবং বেআইনি । বর্তমান সরকার গায়ের জোরে গরিবের পেটে লাথি মারছে, যা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না ।"

    ​তবে এদিনের এই জোরালো প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে অন্য একটি সমীকরণও প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে । অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সুদিনে বা দলনেত্রীর এক ডাকে যে কোনও রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যে সমস্ত ওজনদার এবং প্রভাবশালী মুখদের সর্বদা সামনের সারিতে দেখা যেত, বুধবার ধর্মতলার রাজপথে তাঁদের সিংহভাগেরই দেখা মেলেনি । একদা নেত্রীর ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকা বহু প্রবীণ নেতা, যাঁরা অতীতে দলের যে কোনও সংকট বা কর্মসূচিতে ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন এবং যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতেন, তাঁদের এই চোখে পড়ার মতো অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে । ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ মনে করছেন, রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদলের পর এই আন্দোলন আদতে 'কালীঘাট তৃণমূল'-এর অবশিষ্ট অংশের টিকে থাকার এক কঠিন লিটমাস টেস্ট বা শক্তি পরীক্ষা ।

    ​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই তড়িঘড়ি পথে নামার নেপথ্যে রয়েছে বামপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা । যাদবপুর বা কলেজ স্ট্রিটের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই জোরদার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছে বাম কর্মী-সমর্থকেরা । এই উচ্ছেদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাম শিবির যে নতুন করে রাজপথে 'অক্সিজেন' পাচ্ছে, তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব । সেই কারণেই মূলত কুণাল ঘোষ বা দোলা সেনদের মতো মুষ্টিমেয় কিছু অনুগত সৈনিকদের নিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তড়িঘড়ি রাস্তায় নামতে হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের ।

    ​উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই কলকাতার শিয়ালদা, যাদবপুর থেকে শুরু করে হাওড়া, কৃষ্ণনগর এবং বাঁকুড়া-সহ রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন চত্বর ও সরকারি জমিতে থাকা অবৈধ জবরদখল হটাতে কড়া পদক্ষেপ করছে বর্তমান প্রশাসন । বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারি সারি দোকানপাট । এর ফলে একদিকে সাধারণ যাত্রীদের একাংশ স্টেশন চত্বর ফাঁকা ও পরিষ্কার হওয়ায় যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, ঠিক তেমনই অন্যদিকে রোজগার হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে পথে বসেছে হাজার হাজার হকার পরিবার ।

    ​প্রশাসনের এই উচ্ছেদ অভিযানের জেরে তৈরি হওয়া গরিব মানুষের ক্ষোভ ও অসহায়তাকেই এবার নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চাইছে তৃণমূল । দলের প্রথম সারির বহু চেনা সৈনিকের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নিজে যেভাবে রাজপথে নেমে আন্দোলনের সুর বাঁধতে চাইলেন, তা বর্তমান রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আগামী দিনে নতুন কী মোড় নেয়, এখন সেদিকেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলার রাজনৈতিক মহল ।
  • Link to this news (eTV Bharat)