মালদা, 17 জুন: মাস্ক মেলন৷ খুব বেশি বাঙালি এই নাম কিংবা এই ফলের সঙ্গে পরিচিত নন৷ তাঁরা মূলত তরমুজ কিংবা ওয়াটার মেলনের সঙ্গে পরিচিত৷ তরমুজের মতোই মাস্ক মেলন বা ক্যান্টালুপ একটি গ্রীষ্মকালীন ফল৷ মহারাষ্ট্র, গুজরাত, হিমাচল প্রদেশ, পঞ্জাব, হরিয়ানা-সহ দক্ষিণ ভারতের অনেক রাজ্যে এই ফলের চাষ হয়৷ যদিও বাংলায় সেভাবে এর চাষের কথা জানা যায় না৷ এবার নিজের দু’বিঘা জমিতে সেই ক্যান্টালুপেরই চাষ করেছেন পুরাতন মালদার এক কৃষক৷ প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেছেন তিনি৷ সবকিছু ঠিক থাকলে ভবিষ্যতে চাষের পরিধি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে তাঁর৷ তাঁর এই প্রচেষ্টা আম নির্ভর এই জেলার ফলচাষিদের বিকল্প চাষের সন্ধান দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে৷
মাস্ক মেলনের মধ্যে 90 শতাংশ জল থাকে৷ অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল৷ রয়েছে উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম৷ শরীর আর্দ্র রাখার পাশাপাশি হৃৎপিণ্ড, ত্বক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে৷ 100 গ্রাম ক্যান্টালুপে রয়েছে মাত্র 34 ক্যালরি৷ শরীরকে ডিটক্স করার ফলে শরীর থাকে ঝরঝরে৷ এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি রয়েছে৷ অর্থাৎ সংক্রমণ ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতাও রয়েছে৷ মাস্ক মেলনে থাকা ফাইবার ও এনজাইম কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং পুষ্টি শোষণে সহায়ক৷ চোখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতেও এই ফলের জুড়ি মেলা ভার৷
কিছুদিন আগে চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন পুরাতন মালদার মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েতের আদিনা রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকার এক যুবক মনতোষ রাজবংশী৷ পেশায় চাষি হলেও এগ্রিকালচার বিষয়ে ডিপ্লোমা করেছেন তিনি৷ বাপ-ঠাকুরদার প্রথাগত পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষবাস করেন৷ বেঙ্গালুরুতেই তিনি প্রথম মাস্ক মেলন দেখেন৷ এই অপরিচিত ফল খেয়ে ভালো লেগে যায় তাঁর৷ তখনই ঠিক করেন, তিনি নিজের জমিতে এই ফলের চাষ করবেন৷
সেই ভাবনা থেকেই এবার প্রথম তিনি নিজের দু’বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মাস্ক মেলনের চাষ করেছেন৷ ইতিমধ্যে জমি থেকে ফল উঠতে শুরু করেছে৷ প্রথমবার তিনি কলকাতা ও শিলিগুড়ির বাজার বেছে নিয়েছেন৷ সেখানকার ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন৷ আগামিকালই শিলিগুড়ি থেকে একজন ব্যবসায়ী তাঁর ফল কিনতে মালদায় আসছেন৷ আপাতত সেদিকেই তাকিয়ে তিনি৷
বাড়ি আদিনা স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হলেও মনতোষ পুরাতন মালদারই নারায়ণপুর এলাকায় 12 নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে থাকা জমিতে ক্যান্টালুপের চাষ করেছেন৷ তিনি বলছেন, “আমাদের এলাকার মানুষজন তরমুজ বা ওয়াটার মেলনের সঙ্গেই পরিচিত৷ মাস্ক মেলনের বিষয়ে অনেকেরই জানা নেই৷ এই ফল মূলত বাইরে চাষ হয়৷ মহারাষ্ট্র, গুজরাত, পঞ্জাব, হরিয়ানার মতো জায়গায় এর পরিচিতি রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গে এর চাষ খুব কমই হয়৷ মালদায় প্রথম আমিই এর চাষ করছি৷ বেঙ্গালুরু গিয়েছিলাম৷ সেখানে পেঁপের সঙ্গে এই ফল কেটে বিক্রি হয়৷ সেখানে এই ফল খেয়ে আমার ভালো লেগে যায়৷ বাইরে থেকে বীজ সংগ্রহ করি৷ মাস্ক মেলন ফলাতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে৷ যেভাবে শসা চাষ করা হয়, ঠিক একই পদ্ধতিতে এর চাষ হয়৷”
মনতোষ আরও বলেন, “মূলত নেট হাউসেই এই ফলের চাষ হয়৷ আমিও সেভাবে চাষ করেছি৷ তবে ঝড়বৃষ্টিতে নেট হাউস ভেঙে গিয়েছে৷ মাস্ক মেলন চাষে প্রতি বিঘাতে প্রায় 50 হাজার টাকা খরচ হয়৷ শিলিগুড়ি কিংবা কলকাতায় এর ভালো চাহিদা রয়েছে৷ মালদার অতুল মার্কেট বা রথবাড়ি মার্কেটে এখন মাস্ক মেলন 230-240 টাকা কিলো দরে বিক্রি হচ্ছে৷ এবার আমার উৎপাদিত ফল শিলিগুড়ি আর কলকাতা যাবে৷ আগামিকালই শিলিগুড়ি থেকে ভেন্ডার ঢুকবে৷ এক বিঘাতে দু’লাখ টাকা উপার্জন করার লক্ষ্য রয়েছে৷ এখন দেখা যাক কী হয়৷”
কিন্তু প্রথার বাইরে বেরিয়ে আমের জেলা মালদায় মাস্ক মেলনের চাষ কি ঝুঁকিপূর্ণ নয়? মনতোষ বলছেন, “এই ফল দেখতে খুব একটা ভালো নয়৷ এর দুটো প্রজাতি৷ একটির রং সাদা, আরেক প্রজাতির রং ঘন সবুজ৷ কিন্তু এই ফল ভীষণ সুস্বাদু৷ পুষ্টিগুণও বেশ ভালো৷ 2011 সাল থেকে আমি চাষ করছি৷ বাপ-ঠাকুরদার পথ ছেড়ে আমি প্রাকৃতিক ভিত্তিতে চাষ করি৷ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারও এখন জৈব পদ্ধতিতে চাষ করার কথা বলছে৷ বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করলে জমির মাটি খারাপ হয়ে যায়৷ প্রথম প্রথম যেকোনও কাজে সমস্যার মুখে পড়তে হয়৷ মানুষ যখন এই ফলের বিষয়ে জানতে পারবে তখন মাস্ক মেলনের চাহিদা বাড়বে বলে আমি নিশ্চিত৷”