• দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার অসিতের
    এই সময় | ১৮ জুন ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, চুঁচুড়া

    বর্তমানে জেলবন্দি চুঁচুড়ার প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদারকেই তৃণমূলের শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি করা হলো। গত বিধানসভা নির্বাচনে অসিতকে টিকিট না দিয়ে চুঁচুড়ায় প্রার্থী করা হয়েছিল দেবাংশু ভট্টাচার্যকে। তা নিয়ে শুরুতে দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেও, পরে অবশ্য দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে প্রচারে অংশ নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের বিপর্যয়ের পরে দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী বসে গেলেও, রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি অসিত।

    বারুইপুরে তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে হামলার পরে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এত কিছুর পরেও দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য অটুট রয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, জেলা সভাপতি পদে বসিয়ে তারই পুরস্কার দিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

    বিধানসভা ভোটে ভরাডুবি ও রাজ্য থেকে ক্ষমতাচ্যুত হতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে তৃণমূল। টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পরেও রাজপাট হারানোর মাস খানেকের মধ্যেই ভেঙে খানখান ঘাসফুলের সাম্রাজ্য। নির্বাচনে পরাজয়ের পরেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেন। বিধানসভা ভোটের ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার নিজের হাতেই সাংগঠনিক রদবদল করলেন নেত্রী। শুধু তাই নয়, দলের পুরোনো মুখদের নেতৃত্বে ফিরিয়ে এনে অভিষেক-তন্ত্রে লাগাম টানারও স্পষ্ট বার্তা দিলেন মমতা।

    কলকাতার পাশাপাশি এক সময়ের তৃণমূলের দুর্গ হুগলি জেলাতেও দলের পুরোনো মুখ চুঁচুড়ার প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদারকে শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি করে দলের নিচু তলার কর্মীদের সেই বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। যদিও ভোটের ফল প্রকাশের পরে একটি পুরোনো মামলায় পুলিশি গ্রেপ্তারের পরে আদালতের নির্দেশে বর্তমানে হুগলি সংশোধনাগারে রয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদার। দলে 'মমতাপন্থী' হিসেবে পরিচিত অসিতের সঙ্গে সংশোধানাগারে দেখা করতে গিয়ে দলের কর্মীরা তাঁকে নতুন দায়িত্বের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। কর্মীদের মুখে নতুন দায়িত্বের কথা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অসিত।

    চোখের দুই কোন চিকচিক করে ওঠে। কোনও রকমে নিজেকে সামলে অসিত বলেন, 'দিদি যদি প্রথম থেকে নিজের মতো করে দলের দিকে নজর দিতেন, তা হলে আমাদের এ রকম দুরবস্থা হতো না।' অসিত ওই কর্মীকে বলেন, 'যাই হোক, কংগ্রেস থেকে দিদির হাত ধরেছি। ভিখারি পাসোয়ান থেকে সিঙ্গুর- দলের সমস্ত কর্মসূচিতে ছিলাম। এখন কঠিন সময়েও দিদির হাত ছাড়ব না। আজ, বৃহস্পতিবার চুঁচুড়া আদালতে অসিতের মামলার শুনানি। সেই দিকেই তাকিয়ে দলের নিচু তলার কর্মীরা।

    রাজ্যে পালাবদল ও বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের উপরে হামলা ও দলীয় পার্টি অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ফেরাতে জেলা সদর চুঁচুড়ায় প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেন অসিত। এর জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া ছিল বলে তৃণমূলের দাবি। ঘটনাচক্রে ওই দিন বিকেলেই দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আক্রান্ত হন।

    প্রতিবাদ মিছিলে সেই খবর পান অসিত। তখনই দলের বাকি নেতা-কর্মীদের নিয়ে চুঁচুড়ায় রাস্তা অবরোধ করেন। সেই সময়ে পুলিশও হাজির ছিল। ওই দিনই পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে অসিত মজুমদার-সহ তৃণমূলের নেতাকর্মী-সহ প্রায় ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার পরে ২০২২ সালের একটি পুরোনো যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অসিতকে ফের গ্রেপ্তার করা হলে, ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয় চুঁচুড়া আদালত। দলের একাংশের মতে, সবাই যখন ভোটে পরাজয়ে দলকে কাঠগড়ায় তুলেছে, তখন দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন অসিত।

    দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অসিতের মতো পুরোনো কর্মীদের উপরে নেত্রী ভরসা করায়, উজ্জীবিত নিচু তলার কর্মীরা। তাঁদের কথায়, বাম জমানা থেকে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন অসিত। কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল তৈরির দিন থেকে অসিত নেত্রীর সঙ্গে ছিলেন। ২০১১ সালে তৃণমূলের টিকিটে চুঁচুড়া থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন অসিত। পর পর তিনবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে চুঁচুড়ায় হ্যাটট্রিক করেন অসিত।

    ২০১৯ সালে লোকসভায় তৃণমূলের ফল খারাপ হলেও, ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে চুঁচুড়া কেন্দ্রে লকেট চট্টোপাধ্যায়কে পরাস্ত করে চুঁচুড়ায় বিজেপিকে রুখে দেন অসিত। ২০২৪ সালে হুগলি কেন্দ্রে সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিতিয়ে আনার পিছনেও অসিতের ভূমিকা ছিল। কিন্তু এর পরেই রচনার সঙ্গে অসিতের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অনেকেই মনে করেন, রচনা কলকাঠি নাড়াতেই এ বার অসিত মজুমদারকে প্রার্থী করেনি তৃণমূল। কিন্তু তার পরেও দলের শৃঙ্খলা মেনে ভোটে প্রার্থীর হয়ে লড়াই করেছিলেন। এ বিষয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি প্রিয়াঙ্কা অধিকারী বলেন, 'সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীবাজি করে অসিত মজুমদারকে বঞ্চিত করেন। কিন্তু দল ক্ষমতাচ্যুত হতেই, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রচনা এ-ও বলছেন, ১৫ বছরে অনেক কাজ করা যায়নি। এই দ্বিচারিতার জবাব মানুষ ঠিক সময়ে দেবেন।' শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন তৃণমূলের সভাপতি অরিন্দম গুঁই বলেন, 'অসিত মজুমদার আমাদের সিনিয়র লিডার। তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা ভোটে হেরে যেতে পারি, কিন্তু হারিয়ে যাইনি।'

  • Link to this news (এই সময়)