অমিয়কুমার বিশ্বাস, কৃষ্ণনগর: কৃষ্ণনগর রেল স্টেশন মানেই শুধু ট্রেনের আসা-যাওয়া নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক বিশেষ স্বাদ, এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য— কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত ডালপুরি। বছরের পর বছর ধরে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও সংলগ্ন এলাকায় ডালপুরির দোকানগুলি শুধু ব্যবসার কেন্দ্র ছিল না, বরং কৃষ্ণনগরের পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানের পর সেই পরিচিত দৃশ্য আজ অতীত। স্টেশন চত্বরে এখন আর শোনা যায় না সেই চিরচেনা ডাক— “ডালপুরি, ডালপুরি...”। আর এই নীরবতাই যেন মন খারাপ করে দিচ্ছে নিত্যযাত্রী থেকে দূরপাল্লার যাত্রী সকলকেই। গত ১৬ জুন মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়সীমার শেষে রেলের জমি খালি করার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর স্টেশন এলাকার বহু পুরনো দোকানের সঙ্গে উঠে গিয়েছে ডালপুরির দোকানগুলিও। যে জায়গাগুলো একসময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে সরগরম থাকত, আজ সেখানে শুধু ফাঁকা জায়গা আর স্মৃতির ভার।
কৃষ্ণনগরের ডালপুরির সুনাম বহু পুরনো। জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই ডালপুরির নাম ছড়িয়ে পড়েছে। বহু যাত্রী শুধুমাত্র এই ডালপুরির স্বাদ নেওয়ার জন্য কৃষ্ণনগর স্টেশনে নামতেন। অনেক সময় দেখা যেত, ট্রেন কয়েক মিনিটের জন্য স্টেশনে দাঁড়ালে যাত্রীরা তড়িঘড়ি নেমে ডালপুরি কিনে আবার ট্রেনে উঠে পড়ছেন। হকার উচ্ছেদের পর সেই দৃশ্য আর নেই। স্টেশনে আসা বহু যাত্রীর মুখে এখন একটাই প্রশ্ন— “কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত ডালপুরি কি আর পাওয়া যাবে না?
বহরমপুর থেকে আসা যাত্রী সুভাষ দেবনাথ বলেন, আমায় কাজের সূত্রে সপ্তাহে প্রায় দুই দিন কৃষ্ণনগর আসতেই হয়। আর কৃষ্ণনগর আসা মানেই স্টেশনের গৌর কেবিনের ডালপুরি আমায় খেতেই হবে। কিন্তু আজ জায়গাটা পুরো ফাঁকা। খুব খারাপ লাগছে দেখে। দু’বছর ধরে গড়ে ওঠা অভ্যাস স্টেশনে এসে ডালপুরি খেতে হবে, সেটা আর থাকল না।
ডালপুরির এক দোকান মালিক ছোটন সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে এই দোকান শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে আমরা এই ব্যবসার সঙ্গেই জড়িয়ে আছি। কৃষ্ণনগরের ডালপুরির যে সুনাম তৈরি হয়েছে, তা একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম এবং মানুষের ভালোবাসার ফলেই এই পরিচিতি এসেছে। কিন্তু আজ একদিনের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে গেল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেনা অচেনা কত মানুষের সঙ্গে রোজ কথা হতো। একদিনেই সব শেষ।
স্টেশনের নিয়মিত যাত্রীদের একাংশ জানান, কৃষ্ণনগর স্টেশনের অন্যতম আকর্ষণই ছিল এই ডালপুরি। প্রতিদিন অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যাত্রীরা এই দোকানগুলিতে ভিড় জমাতেন। গরম গরম ডালপুরির সঙ্গে আলুর তরকারি এই স্বাদ অনেকের কাছেই ছিল কৃষ্ণনগরের স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সেই স্বাদ ও পরিবেশ পুরোপুরি হারিয়ে গেল। এখন যাত্রীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্ন— কৃষ্ণনগর স্টেশনের বিখ্যাত ডালপুরির সেই ঐতিহ্য কি আবার কোনোদিন ফিরে আসবে না?