নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: পুজোর বেশি দেরি নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ সময় প্রবল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন মৃৎশিল্পীরা। প্রতিমা তৈরির মাটি সরবরাহ পড়েছে তীব্র সংকটে। ফলে কলকাতা তো বটেই হাওড়ার কুমোরপাড়াগুলিতেও থমকে রয়েছে কাজ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মধ্য হাওড়ার এক মৃৎশিল্পী বাধ্য হয়ে লিখে রেখেছেন, ‘বরাত নেওয়া বন্ধ’। মাটি না মেলায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে উত্তর হাওড়ার ভাঁড়পট্টিতেও।
হাওড়ার তেলকল ঘাটের মৃৎশিল্পী বাসুদেব পাল ও সুরজিৎ পাল বলেন, ‘প্রতিমা তৈরির জন্য গঙ্গার পলিমাটি লাগে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এঁটেল মাটি। সাধারণত গঙ্গার পলিমাটি আসে বাসুদেবপুর ও বালি থেকে। আর এঁটেল মাটি আসে উলুবেড়িয়া ও ডায়মন্ডহারবার থেকে। বর্তমানে পলিমাটির জোগান থাকলেও এঁটেল মাটি আসা কার্যত বন্ধ।’ এর ফলে তাঁদের মূর্তি তৈরির কারখানায় গোটা ছয়েক প্রতিমার কাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তাঁরাও নতুন বরাত নিতে পারছেন না। অন্যান্য মৃৎশিল্পীদের বক্তব্য, অন্যবছর এই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১২টি দুর্গাপ্রতিমার বরাত নেওয়া হয়ে যায়। পাশাপাশি চার-পাঁচটি প্রতিমা তৈরির কাজ অনেকটা এগিয়ে যায়। কিন্তু এবার কাজ করা যাচ্ছে না। অনেক পুজো উদ্যোক্তা প্রতিমার আকার ছোটো করার প্রস্তাব দিয়েছে। তা সত্ত্বেও মাটি না মেলায় শিল্পীরা মূর্তি তৈরির আশ্বাস দিতে পারছেন না। এমনকি কাঠামোয় বিচালি বাধার কাজ পর্যন্ত করছেন না।
মধ্য হাওড়ার রাজবল্লভ সাহা লেনের মৃৎশিল্পী বিপ্লব দাস জানান, প্রতিবছর ১৮টির মতো দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেন। কিন্তু এবার একটি অর্ডারও নিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে একসপ্তাহ আগে কারখানার গেটে নোটিস টাঙিয়ে দিয়েছেন। প্রশস্ত পটুয়াপাড়ার মূর্তি তৈরির একাধিক কারখানা কার্যত বন্ধ। এর পাশাপাশি ছোটো কারিগরদের অনেকেই আগেভাগে গোডাউন ভাড়া নিয়ে ফেলেছিলেন। কাজ না থাকলেও এখন তাঁদের ভাড়ার টাকা গুনতে হচ্ছে। এছাড়া বেড়েছে প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম। পাটের দড়ির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিমার নকল চুলের প্যাকেট ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০০ টাকা। বিচালির দাম বাড়তে চলেছে। মাটির দাম আগে ট্রাক পিছু ছিল ২৫ হাজার। শিল্পীদের আশঙ্কা, নতুন করে মাটি সরবরাহ শুরু হলে বর্ষার কারণে দাম বেড়ে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
মধ্য হাওড়ার ৭৫ বছরের রানা সংঘের কর্তা প্রসেনজিৎ বোস বলেন, ‘প্রতিমার বরাতই তো দিতে পারছি না। বেশি অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েও শিল্পীদের রাজি করানো যাচ্ছে না। মাটি না এলে পুজো প্রস্তুতি হবে কী করে?’ আশঙ্কায় উত্তর হাওড়ার ভাঁড়পট্টির কারিগররাও। তাঁদের বক্তব্য, ‘মাটির জোগান দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।’ নিজস্ব চিত্র