• পুরোনো আইনই কি শিল্পে অস্ত্র! বাজেটে ফিরবে ইনসেনটিভ?
    এই সময় | ১৮ জুন ২০২৬
  • সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়

    ১৩ বছর ধরে পড়েছিল একটি আইন। শিল্পের জন্য জমি সংক্রান্ত এই কেন্দ্রীয় আইন দেশের বেশিরভাগ রাজ্য কার্যকর করে ফেললেও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের দীর্ঘ জমানায় তা ফাইলবন্দি হয়েই পড়েছিল। বাংলায় শিল্পায়নের পথ থেকে কাঁটা সরাতে এ বার ধুলো ঝেড়ে বের করে সেই আইনকে রাজ্যে মান্যতা দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে বিজেপি সরকার।

    জমিজট কাটিয়ে বিনিয়োগ ও পরিকাঠামোর উন্নয়নের পথকে মসৃণ করতে ২০১৩–তে তৎকালীন ইউপিএ সরকার ‘জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপনে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং স্বচ্ছতার অধিকার’ (এলএআরআর) আইন সংসদে পাশ করেছিল। এই আইন সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে কার্যকর করার জন্য তার বিধি প্রণয়ন করার কথা। এই কেন্দ্রীয় আইনে বলা রয়েছে, যে কোনও প্রকল্পের জন্য অধিগৃহীত জমি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত পাঁচ বছর) ব্যবহার না করে ফেলে রাখলে, তা জমির মালিকদের বা সংশ্লিষ্ট সরকারের জমি ব্যাঙ্কে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর ফলে পিপিপি মডেলে বা সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য কোনও জমি নেওয়ার পরে তা অনির্দিষ্ট কাল ফেলে রাখার সুযোগ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থা দ্রুত প্রকল্পটি রূপায়ণ করতে বাধ্য থাকবে।

    পশ্চিমবঙ্গেও দেখা গিয়েছে, বহু সংস্থা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি সরকারের মাধ্যমে নিয়ে বছরের পর বছর ফেলে রেখেছে। তাই রাজ্যের নতুন সরকার এই জমি অধিগ্রহণ আইনকেই মান্যতা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিধি তৈরি করে বিধানসভায় পেশ করার প্রস্তাব বিবেচনা করছে। এই আইনে জমি অধিগ্রহণের আগে জনস্বার্থ, স্থানীয় বাসিন্দাদের উপরে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সামাজিক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে গণশুনানির মাধ্যমে জমিহারাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়াও দেখতে হবে, ওই শিল্পের ফলে পরিবেশে কোনও প্রভাব পড়বে কি না।

    সূত্রের খবর, বাম এবং তৃণমূল আমলে শিল্পের নামে রাজ্যে জমি নিয়েছে বহু সংস্থা। তবে অনেকে সেই জমির সম্পূর্ণ বা আংশিক ব্যবহারও করেনি। অন্যদিকে, জমির অভাবে জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থমকে গিয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বারবার শিল্পায়নের জন্য উপযুক্ত আবহ তৈরির বার্তা দিয়েছেন শিল্পপতি ও বণিকমহলের উদ্দেশে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী এও জানিয়েছেন, শিল্পের নাম অতীতে যাঁরা জমি নিয়ে শিল্প করেননি, অন্য কাজে ব্যবহার করেছেন অথবা ফেলে রেখেছেন, তাঁরা এখন তা রক্ষা করার জন্য নতুন করে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইলে রাজ্য সরকার তা মেনে নেবে না। শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের হিস্ট্রি যাচাই করা হবে।

    এই পরিস্থিতিতে ১৩ বছরের পুরোনো কেন্দ্রীয় আইন বঙ্গে কার্যকর করার‍ ভাবনাচিন্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বুধবার এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজ্যে শিল্প স্থাপনের জন্য পূর্বতন সরকার কোনও জমি নীতি করেনি। ল্যান্ড ব্যাঙ্ক নিয়েও স্পষ্ট কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শিল্পের জন্য ইনটেনসিভ রাজ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। ফলে এই সংক্রান্ত আইন–বিধি সব কিছু নিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করতে হবে। এখনই এ নিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে কিছু বলছি না।’ সূত্রের দাবি, শিল্পে ইনসেনটিভের প্রস্তাবও এ বারের রাজ্য বাজেটে থাকতে চলেছে।

    শিল্প দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, রাজ্য সরকার জমি নীতি নিয়ে কিছুটা সতর্ক পদক্ষেপ করতে চাইছে। কত সরকারি জমি রয়েছে, কতটা জবরদখল হয়ে রয়েছে— এই সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করার উপরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বহু জায়গায় শুধু গরিব মানুষকে সরিয়ে সরকারি জমি দখল করে বহুতল আবাসনও তৈরি হয়ে গিয়েছে। কলকাতার উপকণ্ঠেও এই নজির রয়েছে বলে ভূমিরাজস্ব দপ্তরের কর্তাদের একাংশের দাবি। সরকার এই জবরদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের বক্তব্য, ১৩ বছর আগে এলএআরআর আইন সংসদে পাশ হলেও তৃণমূল সরকার কিছুটা জেদ করেই তা রূপায়ণ করেনি। পরিবর্তে বিনিয়োগ বা রাস্তা সম্প্রসারণ— সবকিছুর জন্যই প্রয়োজনে খোলা বাজার থেকে জমি কিনে নেওয়ার নীতি নেয়। যদিও অন্য প্রায় সব রাজ্যই নিয়ম মেনে এই আইনের উপরে নিজ নিজ রাজ্যের উপযোগী বিধি তৈরি করেছে।

    তৃণমূল সরকার খোলা বাজার থেকে জমি কেনার সময়ে বাজারদরের উপরে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত দাম ধার্য করার ব্যবস্থা চালু করেছিল। কিন্তু এলএআরআর আইন কার্যকর করে জমি অধিগ্রহণ করলে জমির মালিককে উচ্চতর হারে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় জমির বাজারদরের চারগুণ পর্যন্ত এবং শহরাঞ্চলে দ্বিগুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে বাসস্থান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আর্থিক সহায়তা–সহ পরিকাঠামোগত সাহায্য নিশ্চিত করার কথাও এই আইনে বলা হয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)