• মাটির আকাল, পুজোর ৪ মাস বাকি থাকলেও কুমোরটুলিতে থমকে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ
    আজ তক | ১৮ জুন ২০২৬
  • কুমোরটুলিতে এখন অন্য বছরের মতো ব্যস্ততার ছবি নেই। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দুর্গাপ্রতিমার মূল কাঠামো তৈরির কাজ অনেকটাই এগিয়ে যায়। কিন্তু এ বছর মাটি-সঙ্কটের জেরে সেই কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতেও পড়েছে প্রভাব।

    সকালের দিকে কুমোরটুলির গলিতে এখন দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। রোদে শুকোতে দেওয়া প্রতিমার সংখ্যাও হাতে গোনা। কোথাও শুধু খড়ের কাঠামো, কোথাও আবার অর্ধসমাপ্ত মূর্তি। শিল্পীদের অনেককেই দেখা যাচ্ছে কর্মশালার ভেতর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে কিংবা আড্ডা দিতে। প্রতিমার সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরির দোকানগুলিরও অধিকাংশই বন্ধ।

    কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সংস্কৃতি সমিতির সম্পাদক বাবু পাল জানান, গত ২৯ এপ্রিল নির্বাচন হওয়ার পর থেকেই মাটি সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তার ফলে প্রতিমা তৈরির কাজে প্রায় এক মাসের বিলম্ব হয়েছে। যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, খুব শীঘ্রই প্রথম চালান এসে পৌঁছবে এবং কাজ আবার গতি পাবে।

    শিল্পীদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর মাটি সংগ্রহ ও সরবরাহের দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। এতদিন ফালতা, ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং, গোসাবা, জীবনতলা ও উলুবেড়িয়ার মতো নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্রে পাঠানো হতো। কুমোরটুলি ছাড়াও কালীঘাট, সিঁথি, হাওড়া, পানিহাটি, সোদপুর ও বারাসতের মতো এলাকাও এই সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।

    আগে এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন ‘মাটি ব্যবসায়ীরা’। তাঁরা জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করে সরবরাহকারীদের মাধ্যমে শিল্পীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। প্রতি বছর কুমোরটুলি, উল্টাডাঙা ও মানিকতলার শিল্পকেন্দ্রগুলিতে প্রায় ৬০০ ট্রাক মাটি পৌঁছত। একটি ট্রাকের মাটি দিয়ে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি মাঝারি আকারের প্রতিমা তৈরি করা সম্ভব।

    ডায়মন্ড হারবারের এক মাটি ব্যবসায়ী জানান, আগে নদীর পাড় থেকে মাটি তোলা হলেও সেচ দফতরের নিষেধাজ্ঞার পরে পরিত্যক্ত জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা শুরু হয়। ভূমি দফতরের সহায়তায় সেই জমিগুলি চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় স্তরে নতুন আপত্তি ওঠার ফলে মাটি সংগ্রহের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

    এদিকে শিল্পীদের জানানো হয়েছে, এখন থেকে মাটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে তার বৈধতা যাচাইয়ের দায়িত্ব শিল্পীদেরই নিতে হবে। জমির মালিকের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সহ সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হচ্ছে। ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময় নষ্ট হচ্ছে এবং মাটি সংগ্রহে বিলম্ব ঘটছে।

    মাটি না আসায় শুধু প্রতিমা তৈরিই নয়, অন্যান্য মৃৎশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটির ভাঁড় তৈরির কাজও কমে যাওয়ায় বহু জায়গায় চায়ের দোকানগুলিতে কাগজের কাপের ব্যবহার বেড়েছে।

    উল্লেখ্য, শুধু কুমোরটুলিতেই প্রায় ৬০০ শিল্পী সরাসরি কাজ করেন। এছাড়া আরও প্রায় ৩,৫০০ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ। ফলে মাটি সরবরাহে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়বে বিস্তীর্ণ শিল্প ও জীবিকাক্ষেত্রে।

    তবে শিল্পীদের আশা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর খুব শীঘ্রই মাটির জোগান স্বাভাবিক হবে। আর মাটি হাতে পেলেই ফের জোরকদমে শুরু হবে মা দুর্গার আগমনের প্রস্তুতি।

     
  • Link to this news (আজ তক)