ভাষণে অসম্মতি ধনকড়ের, অনুপস্থিত বোস! সংঘাত ইতিহাস কাটিয়ে সরাসরি ‘রবিবচন’ দেখল বাংলা
প্রতিদিন | ১৮ জুন ২০২৬
ডবল ইঞ্জিন সরকারে যেমন সদিচ্ছা থাকলে একসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার জনতার জন্য কাজ করতে পারে, তেমন প্রশাসনিক ক্ষেত্রে লালফিতের ফাঁসও অনেকটা কমে। মসৃণ হয় কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক। একই ভাবে মসৃণ হয় রাজ্য-রাজ্যপাল সমীকরণও। দীর্ঘদিন বাদে যার নজির দেখল বাংলা। কেশরীনাথ ত্রিপাঠি থেকে সি ভি আনন্দ বোস পর্যন্ত-রাজ্যের রাজ্যপালদের সঙ্গে প্রাক্তন শাসকদলের যে অম্লমধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, আর এন রবি-শুভেন্দু অধিকারী জমানায় যে তেমনটা হবে না, সেটা স্পষ্ট হয়ে গেল বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনই।
দীর্ঘদিনের ‘ট্র্যাডিশন’ ভুলে এবার রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে রাজ্যের পাঠানো ভাষণ পূর্ণাঙ্গরূপে পাঠ করলেন রাজ্যপাল আর এন রবি। যে ভাষণের ছত্রে ছত্রে ছিল আগের সরকারের বিভিন্ন ‘জনবিরোধী’ পদক্ষেপের নিন্দা এবং শুভেন্দু অধিকারীর পাঁচ সপ্তাহ পুরনো সরকারের ভূয়সী প্রশংসা। জনবিন্যাস বদল, তোলাবাজি, অত্যাচার, নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে বেআইনি উচ্ছেদ- এহেন যাবতীয় ইস্যুতে রাজ্যের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরলেন তিনি। রাজ্যপালের ভাষণেও শোনা গেল সেই ‘ভয় আউট, ভরসা ইনে’র বার্তা। তাছাড়া বেনজিরভাবে এবারে অধিবেশন শুরুর আগে রাজ্যপালের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারিত হল। পুরোটাই বঙ্গ বিধানসভার নিরিখে বড় বেমানান।
আসলে বঙ্গে রাজ্য ও রাজ্যপাল সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ১৯৬৭ সাল। সেই প্রথম রাজ্যে সরকার বরখাস্ত করার ঘটনা। অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে সে দিন বরখাস্ত করেছিলেন রাজ্যপাল ধর্মবীর। দু’বছর বাদে ফের রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। তখনও রাজ্যপাল পদ ধর্মবীর। ১৯৬৯ সালে রাজ্যপালের যে ভাষণ তৈরি করা হয় সরকারের তরফ থেকে, তাতে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘আমি অন্যায় ভাবে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙেছিলাম।’ ধর্মবীর ভাষণের ওই অংশটা পড়েননি। হাজার চেষ্টা করেও পড়ানো যায়নি। সেই রাজ্যে রাজ্যপালের সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের সংঘাতের শুরুয়াত। এরপর যখনই রাজ্য ও কেন্দ্রে আলাদা সরকার থেকেছে, তখনই রাজ্য-রাজ্যপালের সংঘাত চরমে উঠেছে। ১৯৭১ সালেই রাজ্যপাল শান্তিস্বরূপ ধাওয়ানের সঙ্গে বামেদের গোলমাল শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা পায় ১১৩টি আসন। কংগ্রেস পায় ১০৫টি। কিন্তু বামেদের সরকার গড়তে প্রথমে ডাকেননি ধাওয়ান। রাজ্যপালকে তীব্র কটাক্ষ করে জ্যোতি বসু বলেন, “ধাওয়ানের ধারাপাতে ১১৩-র চেয়ে ১০৫ বড়।” ১৯৮০ সালে ফের দিল্লির মসনদ ইন্দিরা গান্ধীর হাতে যেতেই রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাত শুরু হয়। সে দফায় বি ডি পাণ্ডেকে রাজ্যপাল করে পাঠিয়েছিলেন ইন্দিরা। সেবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত বলেছিলেন, ‘বি ডি মানে ভৈরবদত্ত নয়, বঙ্গদমন’।
এরপরও ছুটকোছাটকা বিবাদ রাজ্যপালের সঙ্গে করেছে বামেরা। সেই বিবাদ চরমে ওঠে গোপালকৃষ্ণ গান্ধী রাজ্যপাল থাকার সময়। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে গুলিচালনার ঘটনার পরে রাজ্যপাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ‘হাড় হিম করা সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছিলেন নন্দীগ্রামের ঘটনাকে। গান্ধীর সঙ্গে মমতার সুসম্পর্ক নিয়েও বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তৃণমূল জমানাতেও সেই একই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কেশরীনাথ ত্রিপাঠী থেকে শুরু করে সি ভি আনন্দ বোস পর্যন্ত-রাজ্যপাল পদে মুখ বদল হলেও পরিস্থিতি বদল হয়নি। কেশরীনাথ ত্রিপাঠী নিয়মিত বিবৃতি দিয়ে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা করতেন। জগদীপ ধনকড় নিত্য সোশাল মিডিয়ায় নিজের ‘অপমানিত’ হওয়ার কাহিনি বলতেন। সরকারের সমালোচনা করতেন। বিধানসভা অধিবেশনে একাধিকবার রাজ্যের দেওয়া ভাষণ পড়তে অস্বীকার করেছেন ধনকড়। বাজেট ভাষণ পড়তে গিয়ে একটা লাইন পড়ে চলে এসেছেন, সেই ছবিও দেখেছে বঙ্গ বিধানসভা। তবে সংঘাত সবচেয়ে বেড়েছিল শেষ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে। রাজ্যপালের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করেছে তৃণমূল সরকার। পালটা উপাচার্য নিয়োগ থেকে বিল পাশ-সবেতে বেনজির সংঘাত দেখা গিয়েছে। এমনকী অধিবেশনের শুরুতে রাজ্যপাল ভাষণ দিতে অনুপস্থিত থাকছেন সেই ছবিও দেখেছে বাংলা।
এবার সেই ছবি বদলে গেল। আর এন রবি রাজ্যের পাঠানো পূর্ণাঙ্গ ভাষণ পাঠ করলেন। সেটা পুরোপুরি সম্প্রচারিত হল, সেটাও বেনজির। কথায় আছে মর্নিং শো’জ দ্য ডে। যেভাবে রাজ্য সরকার এবং রাজ্যপালের মধ্যে সুসম্পর্ক দেখা গেল, সেটা আগামী দিনে চললে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বহু কাজেই সুবিধা হবে। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগ, বিল পাশের মতো ইস্যুতে সমস্যায় পড়তে হবে না রাজ্য সরকারকে।