দালানে লম্বা করে বিছানা পাতা হয়েছে। বাবা, কাকা, জ্যাঠা সব একসঙ্গে শোবে। সকালে ভাইফোঁটা ছিল। সারাদিন খাওয়াদাওয়া, হাসিঠাট্টা চলেছে। শরীর আর দিচ্ছে না। পরপর চারটে মাদুর, তার উপরে তোষক। শেষে বিছানার চাদর। ট্রাঙ্ক থেকে বড় মশারি বেরিয়েছে। কিন্তু খাটাতে গিয়ে বিপত্তি। মশারির খুঁট আর দেওয়ালের হুক পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। এ বার কী হবে?
জ্যেঠু মাথাটা নেড়ে বললেন, ‘দড়ি নিয়ে আয়।’ ছোটকা ছুটল চিলেকোঠায়। ফুল পিসি মাপ নিল। দুটো খুঁটেই যত ঝামেলা। আধ হাত করে হলেই হবে। বলতেই খচাখচ কাঁচি চালিয়ে দিল ছোটকা। তার পরে মশারির গিঁট বেঁধে লাগিয়ে দেওয়া হলো হুকে। ব্যস, নিশ্চিন্তি। গিন্নির আঁচলের খুঁটে যেমন চাবি বাঁধা থাকে, মশারির খুঁটে তেমনই দড়ি। বন্ধনহীন গ্রন্থি, ‘আমরা চলতি হাওয়ার পন্থি।’
দড়ি অনেকটা ত্রাতা মধুসূদনের মতো। ডাকলেই হাজির। সর্বঘটে কাঁঠালি কলা যেন। কখনও মশারির খুঁটে, কখনও গোরুর গলায়। আবার ছাদে মেলা কাচা জামাকাপড় শুকোনোর ভারও তার কাঁধে। পরম মমতায় আগলে রাখে বাঙালির ঘর-গেরস্থালি। আবার সেই দড়িই হয়ে ওঠে শাসকের হাতের অস্ত্র। দাগী অপরাধীর কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হয় পাড়া-বেপাড়ায়। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ঠিক যেমনটা হচ্ছে। ভাবটা যেন, দেখ কেমন লাগে। দড়ি এখন আর ত্রাতা নয়, লজ্জার প্রতীক।
দড়ি শুধু দাগী অপরাধীর কোমরেই জড়ায়নি, কখনও কখনও তা জড়িয়েছে বিদ্রোহের শরীরেও। কাজী নজরুল ইসলামকে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছিল রাজদ্রোহের অভিযোগ। ঔপনিবেশিক শাসন জানত, প্রকাশ্য অপমানও ক্ষমতার এক ভাষা। কিন্তু সেই ভাষা যে স্বাধীনতার পর সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে, এমনও নয়। হাংরি জেনারেশনের কবি মলয় রায়চৌধুরীকেও কোমরে দড়ি বেঁধে ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হয়েছিল। সে এক অধ্যায়। সময় আর শাসকের হাত ধরে দড়ির অর্থ বদলেছে বারবার। সে হাঁকপাঁক করেছে দৃষ্টান্ত স্থাপনের আকাঙ্ক্ষায়।
পালাবদলের বাংলায় দড়ির কদর বেড়েছে। ডিমের মতোই। দুর্নীতি, তোলাবাজি, কাটমানির অভিযোগে ধৃত একের পর এক তৃণমূল নেতার অনেকেরই কোমরে দড়ি পরিয়ে এলাকায় ঘোরাচ্ছে পুলিশ। হাতকড়ার মতো এ এক নতুন অঙ্গসজ্জা। ২০১৪-র লোকসভা ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করতে গিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে বসেছিলেন, ‘ক্ষমতায় (কেন্দ্রে) থাকলে মোদীর কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে পাঠাতাম।’ রাজনীতির ময়দানে এমন হুঙ্কার নতুন নয়। ক্ষমতার নিজস্ব ভাষা আছে, আছে নিজস্ব ভঙ্গিও। কিন্তু সময় বড় রসিক। ‘কাহারও সমান নাহি যায়।’
কয়েক দশকের ব্যবধানে বাংলার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে সেই দৃশ্য। তবে অন্য আঙ্গিকে, ভিন্ন প্রতীকে। তৃণমূলের কাছে কার্যত ব্যুমেরাং হয়ে। এক সময়ের দাপুটে নেতা, যাঁদের হুঙ্কারে বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খেত, তাঁদের এ হেন অবতারে দেখে একপ্রকার মজা পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কাঁচড়াপাড়ার অভিজিৎ রায়, উলুবেড়িয়ার দীপঙ্কর ঘোষ, সাঁকরাইলের সাহিন মোল্লা, হাসনাবাদের সমিত কুমার ঘোষদের দেখে কেউ মুখ টিপে হাসছেন। কেউ বলছেন, ‘কর্মফল।’ শুধু পুলিশ নয়। শ্যামপুরে তৃণমূল নেতা সন্ন্যাসী মান্নার অর্ধেক মাথা কামিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়েছেন গ্রামবাসীরাই। পুলিশ তাঁকে গিয়ে উদ্ধার করেছে। এ যেন খাপ পঞ্চায়েতের ভিন্ন রূপ। তবে রসিক বাঙালি এই দৃশ্যেও মজা নিতে ছাড়ছেন না। সুর করে যেন গাইছেন, ‘এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু...।’ কারও আবার দাবি, অতি চালাকের গলায় দড়ি হয়। এঁদের তো তবু কোমরে পরেছে।
আসলে এর মধ্যে প্রকাশ্যে শাস্তির একটা ইঙ্গিত রয়েছে। জনসমক্ষে অপদস্থ করার পুরোনো সামাজিক কৌশল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও এমন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সেটা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে। তৃণমূল নেতাদের অপরাধ কতটা গুরুতর, সেটা আদালত ঠিক করবে। তবে এমন ঘটনায় বিচারপতিরা উদ্বিগ্ন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, গ্রেপ্তার মানেই দোষী নয়। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, আইনের শাসনের আড়ালে কোথাও কি প্রকাশ্য লাঞ্ছনার কোনও অলিখিত প্রথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? চার সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন মনে করিয়ে দিয়ে আইনজীবী অনির্বাণ গুহ ঠাকুরতা বলছেন, ‘এমন ঘটনা সংবিধানের ২১ নম্বর ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। তা ছাড়া বন্দিদেরও মৌলিক অধিকার রয়েছে। শীর্ষ আদালতের গাইডলাইন অনুযায়ী, তা সবাইকেই মেনে চলতে হবে।’
দড়ির ইতিহাসে তাই কেবল বাঁধন নেই, রয়েছে ভারসাম্যের প্রশ্নও। হাটে, বাজারে কিংবা মেলায় যেমন দড়ির খেলা চলে, এ যেন সেই রকমই। উঁচু খুঁটির উপরে বাঁধা সরু দড়ির উপরে মাথায় হাঁড়ি, কলসি নিয়ে ব্যালান্সের খেলা দেখায় কোনও কিশোর বা কিশোরী। লোকে অবাক হয়, পয়সা দেয়। আর তার জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে সরু সুতোর মতোই বিছানো থাকে শুধু দড়িটুকু। বিচার আর প্রতিহিংসার মাঝেও তাই। ব্যবধান একটা দড়ির। একই সঙ্গে ব্যবধান মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো আচরণেরও। এমনটাই মনে করেন মানবাধিকারকর্মী সুজাত ভদ্র। বললেন, ‘আগে অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের মানিয়ে চলতে হবে। তাই বন্দির অধিকার রক্ষা করাটাও আমাদের কর্তব্য।’ তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘পুলিশ কোনও বন্দির সঙ্গেই অবমাননাকর আচরণ করতে পারে না।’
ধৃত তৃণমূল নেতাদের কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশ যে ভাবে তাঁদের প্রকাশ্যে ঘোরাচ্ছে, তাতে মানবাধিকার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, ‘তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমাদের অনেক অভিযোগ আছে। কেউ অনিয়ম করলে, আইন অনুযায়ী আদালতে তার বিচার হবে। কিন্তু আইন, সংবিধান না-মেনে কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় ঘোরানো আসলে ক্ষমতার আস্ফালন। এটা তালিবানি ব্যবস্থা নয়! সংবিধান প্রত্যেককে মর্যাদার অধিকার দিয়েছে।’ অধীরের এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মন্ত্রী আনন্দময় বর্মণ বলেন, ‘আইন আইনের পথে চলবে। আইনি পথেই দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। প্রকাশ্য লাঞ্ছনা সমর্থনযোগ্য নয়। আশা করি, আইনের রক্ষকেরা আইনের দিক মাথায় রেখেই পদক্ষেপ করবেন।’
বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইনের চোখে কোনও নেতা-দাদার ব্যাপার নেই। যে অপরাধ করবে, আইনের চোখে সে অপরাধী। এ রকম ক্রিমিনালকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরালে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ে সমাজের। পাশাপাশি ক্রিমিনালদেরও মব়্যাল ডাউন হয়।’ অর্থাৎ, শুধু আচরণ নয়, এ যেন আসলে এক ধরনের চেতাবনি। বুঝিয়ে দেওয়া, কত ধানে কত চাল। সমাজতত্ত্ববিদ শাশ্বতী ঘোষের কথায়, ‘জনতা বলুন কিংবা পুলিশ, বলতে চাইছে, মনে রেখো, তোমাকে একদিন হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়েছিলাম। বেশি বেড়ো না।’ তবে ‘অভিযুক্ত’-ভেদে দড়ির আচরণ পাল্টে যায় বলেও মনে করেন তিনি। কোনও সময়ে সে তথাকথিত নববধূর মতো লাজুক। সামনে আসতেই চায় না। হাসতে হাসতে শাশ্বতী বললেন, ‘স্বরূপ বিশ্বাসকে দেখুন। তাঁকে কিন্তু দড়ি পরানো হয়নি। প্যারেড করায়নি। কিন্তু জাহাঙ্গির খানকে করিয়েছে। ব্যাপারটা বুঝলেন?’
গভীর বিষয় বটে। ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে?/আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি পরাণ বান্ধিবি কেমনে?’ কার যে হাত বাঁধার চেষ্টা হচ্ছে, আর কার পরাণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্যিই বোঝা দায়। তবে সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায়ের যুক্তি সহজ, সরল। তাঁর কথায়, ‘দড়িতে কারও ক্ষতি হয় না। আবার এটা কেটে বেরোনোও সহজ নয়। আসলে এর একটা ট্র্যাডিশনাল অ্যাসপেক্ট আছে।’ এক সময়ের অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরানো প্রথার কথাও মনে করাচ্ছেন তিনি, ‘আসল কথাটা হলো, লজ্জা দেওয়া। লজ্জা পাওয়ানো। যাতে সে শুধরে যায়। ভবিষ্যতে আর এই কাজ না করে।’ কিন্তু অপমান কি সত্যিই মানুষকে শুধরে দেয়? কে জানে!
গ্রাম বাংলায় দড়ি নিয়ে বহু চালু প্রবাদ রয়েছে। ক্ষোভ, দুঃখ অপমান সব একসঙ্গে যখন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে, তখন কেউ কেউ বলে ওঠে, ‘তোর একটা দড়ি জোটে না রে!’ কিংবা ‘দড়ি-কলসি নিয়ে ডুবে মর’। কিন্তু এই শব্দবন্ধের মধ্যে চূড়ান্ত হাহাকার রয়েছে। রয়েছে অসহায়ের যন্ত্রণা। সাহায্য, অপমান পেরিয়ে সে এক লহমায় হয়ে ওঠে মৃত্যুর প্রতীক। চোখের সামনে ভেসে ওঠে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার বিভীষিকা কিংবা ফাঁসির দড়ির স্মৃতি। দড়ি টানাটানির খেলায় মানুষই তো আসল কুশীলব। কখনও সে ‘অত্যাচারী’ নেতার কোমরে দড়ি পরায়, কখনও মূর্তির। উদয়ন পণ্ডিতরা হাঁক পাড়ে, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’
তবে এই টান মারার একটা রীতি আছে, নীতি আছে। এলোমেলো করে টান মারলে, টানার বিজ্ঞান গায়ে থুতু দেবে, আর বলবে, একেই তছনছ করা বলে। যারা লাট্টু খেলেছে, তারা জানে। দড়ির একপ্রান্ত পাকানো হয় লাটিমের গায়ে। আর শেষ প্রান্তের কিছুটা তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে ধরা থাকে। এ বার ছোড়ার পালা। এটাই আসল। ঠিকঠাক ভাবে ছুঁড়তে পারলে তবেই লাট্টু ঘুরবে। দূরন্ত ঘূর্নিতে পাক লাগবে বনবন। কিন্তু দড়ির টানে একটু এ দিক-ও দিক হলেই মুখ থুবড়ে পড়বে লাট্টু। আসলে গিঁটগুলো একই থাকে, শুধু বদলে যায় হাত। মশারির নিশ্চিন্ত ঘুম থেকে আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত — দড়ি কখনও আশ্রয়, কখনও অপমান, আবার কখনও সতর্কবার্তা। মানুষের জীবনও বোধহয় তেমনই। একফালি দড়ির মতো, কখনও ন্যাতানো, কখনও টানটান।
তথ্য সহায়তা: সৌরভ নন্দী ও এলিনা দত্ত