জ্বালানি বাঁচান! উলটো পথে মোদির যোগ দিবস, নৌকাতেই ৪ কোটির ডিজেল
বর্তমান | ১৯ জুন ২০২৬
সৌম্যজিৎ সাহা ও শ্যামলেন্দু গোস্বামী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও বারাসত: যুদ্ধ চলছে। দেশ সংকটে। তাই এক বছর সোনা কিনবেন না। বিদেশে যাবেন না। আর অবশ্যই জ্বালানি ব্যবহার কমাবেন।—দেশবাসীর উদ্দেশে এই বার্তা দিনকয়েক আগেই দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর এবার তাঁর যোগদিবসের ‘মহাযজ্ঞে’ সম্পূর্ণ উলটো পথে হাঁটছে ডবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকার। যোগ-যজ্ঞ সাজানো হবে ৫০০ বোট ও লঞ্চ দিয়ে। সেই সবই নিয়ে আসা হচ্ছে সুন্দরবন থেকে। এর জন্য কত লিটার ডিজেল পুড়তে চলেছে? প্রায় ৪ লক্ষ লিটার! আর তার খরচ? এখন লিটার পিছু ডিজেল প্রায় ১০০ টাকা হিসাবে ৪ কোটি টাকা! প্রধানমন্ত্রী নিজে যেখানে ‘ব্যয় সংকোচে’র কথা বলছেন, সেখানে স্রেফ ‘নৌকা সজ্জায়’ এই বিপুল খরচ কেন? প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অংশের গোসাবা, বাসন্তী থেকেই ৪৫০’র বেশি বোট ও লঞ্চকে যোগ দিবসে বাবুঘাটে থাকতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বোট রয়েছে ৩৫০টি ও লঞ্চ ১১০। বুধবারই তারা দলে দলে ভাগ হয়ে রওনা দিয়ে দিয়েছে। বেশিরভাগেরই বৃহস্পতিবার রাতে পৌঁছে যাওয়ার কথা। এই জেলায় বোট পিছু ৬৪০ লিটার ডিজেল দেওয়া হয়েছে। আর এক একটি লঞ্চের জন্য বরাদ্দ ৮০০ লিটার ডিজেল। লিটার পিছু ১০০ টাকা দাম ধরা হলে একটি বোট ও লঞ্চের খরচ দাঁড়াচ্ছে যথাক্রমে ৬৪ হাজার ও ৮০ হাজার টাকা। তেল ছাড়া বোটভাড়া ধার্য হয়েছে ৩ হাজার ১০০ টাকা। যাঁরা বোট অথবা লঞ্চে যাচ্ছেন, তাঁদের দৈনন্দিন খরচ বাবদ দেওয়া হবে মাথা পিছু ২৮০ টাকা।
এছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমা থেকে ৩২টি লঞ্চ ও বোট রওনা দিয়েছে বাবুঘাটের উদ্দেশে। এর মধ্যে সরকারি ১২টি লঞ্চ চলে গিয়েছে। সেগুলি পুলিশ, জনস্বাস্থ্য কারিগরি, জেলা পরিষদ ও মহকুমা প্রশাসনের। ছোটো নৌকা গিয়েছে ২০টি। এই জেলায় লঞ্চ প্রতি ৯০০ লিটার ডিজেল ও ছোটো নৌকা প্রতি ৮০০ লিটার ডিজেল দিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে দু’রকম জলযানের ক্ষেত্রে ১০ লিটার করে মোবিল ধার্য করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি লঞ্চের জন্য খরচ হবে ৯০ হাজার টাকা! ৮০ হাজার টাকা খরচ ছোটো নৌকার জন্য। তার সঙ্গে কর্মীদের খরচ তো আছেই। ফলে দুই জেলার শুধু তেলের খরচ ধরলেই সেটা চার কোটি ছুঁয়ে ফেলছে।
সুন্দরবন থেকে সুদূর বাবুঘাট যেতে অন্তত দু’দিন লেগেছে বলে জানা যাচ্ছে। গোসাবা থেকে ঝড়খালি, কৈখালি, ভাগবতপুর, নামখানা, কচুবেড়িয়া, ডায়মন্ড হারবার, হলদিয়া, বজবজ হয়ে ৫৮ গেট পেরিয়ে বাবুঘাট যেতে হয়েছে বোট ও লঞ্চগুলিকে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক বোট মালিক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বলে কথা। নির্দেশ মেনে আমাদের যেতে হবেই। কোনো উপায় নেই। তবে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। মাতলা, ঠাকুরাণ, মুড়িগঙ্গা সহ অন্তত সাত থেকে আটটি নদী পেরোতে হয়েছে। কিছু জায়গায় ব্যাপক ঢেউয়ের মধ্যে পড়তে হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সারারাত বোট চালিয়ে গিয়েছি আমরা অনেকেই। না হলে সময়ে পৌঁছানো যাবে না।’
পূর্বতন সরকারের সময়ে যোগ দিবস নিয়ে এমন মাতামাতি হয়নি। কিন্তু বিজেপি সরকার এই কর্মসূচিকে বিশ্বমানের করতে চাইছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি জ্বালানি ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে এই খরচের মানে কী? গোসাবার বিজেপি বিধায়ক বিকর্ণ নস্কর বলেন, ‘যোগ দিবসের জন্য বোট মালিকদের আহ্বান করা হয়েছিল। ওঁরা স্বেচ্ছায় যাচ্ছেন বাবুঘাট। তেলের খরচের ব্যাপারটি আমার জানা নেই।’