নবান্নের কড়া পদক্ষেপ, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের নতুন কমিটিতে দেব ও হিরণ
eTV Bharat | ১৯ জুন ২০২৬
কলকাতা, 18 জুন: রাজ্যের চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন শিল্পের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং গিল্ডগুলির কাজকর্মে স্বচ্ছতা আনতে এবার বড়সড় প্রশাসনিক রদবদলের পথে হাঁটল রাজ্য প্রশাসন৷ টলিউডের হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনতে নবান্নের তরফে একটি উচ্চ পর্যায়ের 19 সদস্যের নতুন উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ যেখানে রাজনীতির ময়দানের একসময়ের চরম দুই প্রতিপক্ষ দেব এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে একই সঙ্গে দায়িত্ব সামলাতে দেখা যাবে৷
সম্প্রতি রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে প্রকাশ্যে আসা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিতে টলিপাড়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং প্রশাসনিক কাজকর্মে আমূল পরিবর্তনের একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত মিলেছে।
জানা গিয়েছে, গত 8 জুন হাওড়ার নবান্নের কনফারেন্স হলে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন কমিটি এবং পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের একাধিক সমস্যা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই হাই-প্রোফাইল প্রশাসনিক বৈঠকে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তারকা বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় এবং পাপিয়া অধিকারী।
অন্যদিকে, রাজ্য প্রশাসনের তরফে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডঃ সুব্রত গুপ্ত, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি শান্তনু বসু, চলচ্চিত্র অধিকর্তা কৃত্তিবাস নায়ক এবং মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের অতিরিক্ত সচিব শান্তনু বসু। এই প্রশাসনিক বৈঠকের যে কার্য বিবরণী বা মিনিটস অফ মিটিং প্রকাশ্যে এসেছে, তা থেকে স্পষ্ট জানা গিয়েছে যে, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে বর্তমানে প্রায় 40টি কমিটি বা সংস্থা কাজ করছে। অনেক সংস্থার কাজের ধরন কার্যত একই রকম হওয়ার কারণে, সেগুলিকে কীভাবে একসঙ্গে জুড়ে এক ছাতার তলায় আনা যায়, সেই বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার জন্য বৈঠকে উপস্থিত বিনোদন জগতের প্রতিনিধিদেরই বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
Nabanna on Tollywood
তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের নতুন কমিটিতে এক ছাতার তলায় দেব ও হিরণ (ইটিভি ভারত)
টলিপাড়ার অন্দরে গত কয়েক মাস ধরে যে চাপা ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতেই নবান্নের এই তড়িৎ পদক্ষেপ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বৈঠকের নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফেডারেশন এবং গিল্ডগুলির পরিচালন ব্যবস্থা অবিলম্বে পেশাদার ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় এই শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে এই বিনোদন ক্ষেত্রের কর্মসংস্থানের ওপর যে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে প্রশাসনিক স্তরে।
1926 সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনের অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত এই ফেডারেশনের বর্তমান কার্যকরী কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে নথিতে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পের কাজ যাতে বাধাহীন এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, তার জন্য সরকার চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন উপদেষ্টা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
19 সদস্যের এই কমিটিতে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ এবং হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিধায়কদের পাশাপাশি রয়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী (দেব) এবং যিশু সেনগুপ্তের মতো প্রথম সারির অভিজ্ঞ অভিনেতারা। এছাড়া মহেন্দ্র সোনি ও সানি ঘোষ রায়ের মতো প্রখ্যাত প্রযোজক, জয়ন্ত কুণ্ডুর মতো প্রবীণ প্রোডাকশন ম্যানেজার, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক, অমিত দাসের মতো টেলিভিশন পরিচালক এবং তন্ময় দে-র মতো অভিনেতাদেরও এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক স্তরে ডঃ সৌমিত্র মোহন, কৃত্তিবাস নায়ক, শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শান্তনু বসুও এই কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। প্রয়োজনে উপস্থিত বিধায়কদের সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী দিনে আরও অন্যান্য সদস্যদের এই কমিটিতে যুক্ত করা যেতে পারে বলেও নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।
নবান্নের ওই বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা দফতরের অডিটোরিয়াম বা হলগুলি বরাদ্দের বর্তমান পদ্ধতিটি খতিয়ে দেখবেন এবং সব হলের জন্য একটি সাধারণ আবেদনপত্র তৈরির নকশা করবেন। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলির ক্যালেন্ডারে কোনও পরিবর্তন প্রয়োজন কি না, সেটাও তাঁরা সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করবেন।
পাশাপাশি, বর্তমান ফেডারেশন এবং সমস্ত গিল্ডের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সংগ্রহ করে তা বিধায়কদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে।
তবে এই গোটা রদবদলের মধ্যে রাজনৈতিক মহলের সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে দেব এবং হিরণের একই কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি। একসময় ভোটের ময়দানে এবং নিয়মিত বাকযুদ্ধে বাংলার রাজনীতি সরগরম করে রাখতেন টলিউডের এই দুই তারকা। বর্তমানে হিরণ বিজেপিতেই রয়েছেন, তবে দেব তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছেন।
ভোট ময়দানের সেই রাজনৈতিক সংঘাত এখন অতীত, আর তাই টলিউডের হারানো গরিমা ফেরাতে এই দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবার একই মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। সরকারের এই সামগ্রিক উদ্যোগ এবং ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করে বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ সোশাল মিডিয়ায় এই সংক্রান্ত একটি চার পাতার বিজ্ঞপ্তি শেয়ার করেছেন। সেখানে তিনি নিজের সন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছেন, "কীভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলবে, গিল্ড ও ফেডারেশনের কি হবে, প্রস্তাবিত উপদেষ্টা মণ্ডলী কারা, - সব তথ্য দিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ধন্যবাদ সম্মানীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, ধন্যবাদ সুব্রত গুপ্ত মহাশয়, ধন্যবাদ তথ্য সংস্কৃতি দফতর৷"