আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা-র বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। জীবনতলা থানায় এক মহিলার দায়ের করা লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। যদিও এখনও পর্যন্ত অভিযুক্ত পক্ষের তরফে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারিণীর দাবি, ঘটনাটির সূত্রপাত ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। সেই সময় তাঁর পাঁচ বছরের সন্তানকে কয়েকজন সমাজবিরোধী অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। হঠাৎ সন্তানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় নানা জায়গায় খোঁজখবর শুরু করেন। সেই সময় তিনি অভিযুক্তদের একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি নাকি শওকত মোল্লা-র গাড়িচালকের দাদা বলে অভিযোগ।
মহিলার অভিযোগ, সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তি তাঁকে একটি নির্জন ডেরায় ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে প্রথমে মারধর করা হয় এবং পরে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— যখনই ডাকা হবে, তখনই হাজির হতে হবে। অন্যথায় তাঁর সন্তানকে আর কোনওদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি তখন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন।অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নির্যাতনের সময় তোলা ছবি এবং ভিডিও পরবর্তীকালে ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগকারিণীর দাবি, বারবার তাঁকে ওই ছবি ও ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দেখানো হয়। সামাজিক সম্মানহানি, পারিবারিক ভাঙন এবং অপমানের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। নির্যাতিতা জানান, এই ব্ল্যাকমেলের কারণেই তিনি দীর্ঘ সময় কাউকে কিছু বলতে পারেননি।
মহিলার আরও দাবি, পরে ওই অভিযুক্তই তাঁকে শওকত মোল্লা-র ডেরায় পাঠায়। সেখানে গিয়েও তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। অভিযোগ, শওকত মোল্লাও তাঁকে ধর্ষণ করেন। এই ঘটনার পর ভয়, লজ্জা এবং মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি বিষয়টি গোপন রাখতেই বাধ্য হন। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে এই নির্যাতন সহ্য করেছেন বলেই অভিযোগকারিণীর দাবি।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভাঙড়ের চালতাবেড়িয়া অঞ্চলের বামুনিয়া এলাকায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও কয়েকজন। ঘটনার তদন্তভার গ্রহণ করে । তদন্তের স্বার্থে এনআইএ-র একাধিক দল বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালায়।
তদন্তের অংশ হিসেবে NIA-র একটি দল শওকত মোল্লা-র বাড়ি, দলীয় কার্যালয়-সহ একাধিক জায়গায় হানা দেয়। তবে তল্লাশি শুরুর আগেই শওকত এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে জানা যায়। পরবর্তীতে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও তাঁর পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তার নয়— তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে এনআইএ তাঁকে ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলার অন্যতম মূল সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে তিনি জেল হেফাজতে রয়েছেন।
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য, শওকত মোল্লা গ্রেপ্তার হওয়ার পরই তিনি কিছুটা সাহস ফিরে পান। এতদিন যাঁদের ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি, তাঁদের প্রভাব কমেছে বলেই তিনি থানায় অভিযোগ জানাতে পেরেছেন। সুবিচারের দাবিতে তিনি এখন সরব। তাঁর দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
এই অভিযোগ সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বিরোধীরা বিষয়টি নিয়ে শাসকদলকে নিশানা করতে শুরু করেছে। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের প্রতিটি দিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির উপরই এখন নির্ভর করছে এই বহুল আলোচিত মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ।