বেআইনি ভাবে টাকার লেনদেন হতে পারে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এই আশঙ্কা প্রকাশ করে এ বার পুলিশের দ্বারস্থ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার বিধাননগর সাইবার ক্রাইম শাখায় তাঁরা একটি চিঠি দিয়েছেন। সূত্রের খবর, সেই চিঠিতে তৃণমূলের তিন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলিতে আপাতত যাতে কোনও রকম লেনদেন না হয়, তা নিশ্চিত করার আর্জি জানিয়েছেন বিদ্রোহী ঋতব্রতের গোষ্ঠীর ১০ জন বিধায়ক। ঋতব্রতেরা যে তিন অ্যাকাউন্টের উল্লেখ করেছেন চিঠিতে, ঘটনাচক্রে সেই অ্যাকাউন্টের লেনদেন বন্ধের করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসও।
ঋতব্রতের গোষ্ঠী সূত্রে খবর, তাঁরা পুলিশকে যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে বেআইনি লেনদেনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই তিন অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ভাবে টাকার লেনদেন হতে পারে পারে আগামী দিনে। শুধু তা-ই নয়, ইতিমধ্যে সে রকম কিছু গোপন এবং বেআইনি লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তাই তাদের আর্জি, অবিলম্বে সেই সব টাকার উৎস খতিয়ে দেখা হোক। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি অ্যাকাউন্টই সন্দেহজনক বলে দাবি করে সেগুলির লেনদেন বন্ধ করার আর্জি জানিয়েছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা।
আপাতত আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল। দলের একাংশ এখনও দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আছেন। অন্য দিকে, বিধায়কদের একটা বড় অংশ দলের অন্দরে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন ঋতব্রতের নেতৃত্বে। তাঁরাই এখন নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করতে শুরু করেছেন। আর দলের ২০ জন লোকসভার সাংসদ বিদ্রোহ ঘোষণা করে যোগ দিয়েছে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-য়। সেই বিদ্রোহীদের অন্যতম নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে রেখেছেন, তাঁরা ভবিষ্যতে প্রতীক এবং তহবিল দখলের জন্য তৎপর হবেন। ঘটনাচক্রে, এ সব নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যেই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে দলের তহবিলে লেনদেন বন্ধের আর্জি জানিয়েছিলেন অরূপ।
চিঠিতে অরূপ নিজেকে দলের কোষাধ্যক্ষ বলে দাবি করেছিলেন। এ দিকে, গত ৫ জুন দলের সাংগঠনিক রদবদলে তিনি সেই পদ হারান। তাঁর জায়গায় দলের কোষাধ্যক্ষ করা হয় প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে। কিন্তু যে ব্যাঙ্কে দলের অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেই ব্যাঙ্কের কর্তৃপক্ষকে এই রদবদলের কথা আদৌ জানানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে তৃণমূলের শীর্ষ পদাধিকারীরাও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। অরূপ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, তৃণমূলের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে দল এবং দলের তহবিলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। সমস্যা না-মেটা পর্যন্ত দলের তহবিল ‘সুরক্ষিত রাখতে’ এবং ‘অনুমোদনহীন কোনও ব্যক্তি কর্তৃক’ টাকা তোলা বা আদানপ্রদান আটকাতে অ্যাকাউন্টে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার এবং সব রকম লেনদেন বন্ধ রাখা দরকার। ১২ জুন অরূপ এই চিঠি দিয়েছিলেন। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেন ১৬ জুন। অরূপ এ-ও জানিয়েছিলেন, কোষাধ্যক্ষ হিসেবে বেশ কিছু চেকে তিনি সই করে রেখেছিলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সমস্ত চেকের অপব্যবহার করা হতে পারে বলেই তাঁর আশঙ্কা রয়েছে। তাই অ্যাকাউন্টের লেনদেন বন্ধ রাখার আর্জি জানিয়েছেন। কার্যত এই একই দাবি নিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হলেন ঋতব্রত গোষ্ঠীও।
এ বিষয়ে মমতার শিবিরের নেতা তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘দল সংক্রান্ত বিষয় ওঁরা দলকে জানাচ্ছেন না কেন? এই দলের প্রতীকেই তো জিতে এসেছেন মাসখানেক আগে। এত কিছু যদি ভুল হয়ে থাকে, তো দলকে জানান চিঠি দিন। এখানে কোন উদ্দেশ্যটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে? বেআইনি কাজের তদন্ত চাওয়া নাকি দলকে বিপাকে ফেলা?’ এ সব নিয়ে তৃণমূলকে কটাক্ষ করেছেন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তিনি বলেন, ‘এটা তো জনগণের টাকা। জনগণের যে টাকা লুট হয়েছে, সেই টাকা। এখন এটার ভাগাভাগি নিয়ে এ সব চলছে। আমি তো বলব, ইডি দেখুক বিষয়টা। অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করে দিক।’