'মাসি' বলে ডাকলেই ঘটে আজব কাণ্ড, অর্ধভগ্ন এই সাঁকো আজও রহস্যে ভরা! স্বচক্ষে দেখে আসুন
News18 বাংলা | ২০ জুন ২০২৬
পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম ব্লকের উদ্ধারণপুর গ্রামের অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি রহস্যময় লাল রঙের প্রাচীন স্থাপত্য। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাসি সাঁকো’ বা ‘মাসি সেতু’ নামেই বেশি পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে এই সাঁকোকে ঘিরে নানা লোককথা, জনশ্রুতি এবং রহস্য ছড়িয়ে রয়েছে এলাকায়। কেউ বলেন, একসময় এখানে ‘মাসি’ বলে ডাক দিলে প্রতিধ্বনি ফিরে আসত। আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো অলৌকিক কাহিনি।
কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত গল্পের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃত ইতিহাস। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. স্বপন কুমার ঠাকুরের দাবি, বহুল পরিচিত ‘মাসি সাঁকো’ আসলে সুলতানি আমলের একটি প্রাচীন পাঁচ খিলানবিশিষ্ট সাঁকোর ধ্বংসাবশেষ। বর্তমানে এর তিনটি খিলানের অংশ দৃশ্যমান থাকলেও বাকি অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে। তাঁর মতে, এই সাঁকোটি নির্মিত হয়েছিল প্রাচীন শিবাই নদীর ওপর, যা একসময় এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে পরিচিত ছিল। গবেষকের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাচীনকালে এই পথটি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন জনপদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল।
নৈহাটি, বহরান, সালার হয়ে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এই সড়কপথ এবং সাঁকোর বিশেষ গুরুত্ব ছিল বলে তিনি মনে করেন। সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং যাতায়াতের প্রয়োজনেই এই ধরনের স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়েছিল। ড. ঠাকুর আরও জানান, বর্তমানে যাকে অনেকেই ‘শিয়াল নালা’ বলে চেনেন, সেটিই সম্ভবত অতীতের শিবাই নদীর অংশ। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে যায়, বন্যা ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে নদী প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে ঐতিহাসিক এই সাঁকোটিও। ‘মাসি সাঁকো’ নামটির উৎস নিয়েও রয়েছে নানা মত। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে ‘মাসি’কে ঘিরে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত থাকলেও গবেষকের মতে, এর সঙ্গে প্রাচীন এক লোকদেবীর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তিনি দাবি করেন, কালক্রমে সেই লোকদেবীকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলে বিভিন্ন বিশ্বাস ও আচার গড়ে ওঠে, যার ছাপ আজও লোকসংস্কৃতিতে দেখা যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শতাব্দী প্রাচীন এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য আজও যথাযথ সংরক্ষণের আওতায় আসেনি। গবেষকদের একাংশের মতে, দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই মূল্যবান ঐতিহ্যের আরও ক্ষতি হতে পারে। তাঁদের দাবি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ‘মাসি সাঁকো’কে হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। রহস্য, লোককথা, ইতিহাস এবং লোকসংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘মাসি সাঁকো’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে সাক্ষ্য বহন করে চলা এই স্থাপত্য যেন আজও অতীতের বহু অজানা গল্প শোনাতে চায় নতুন প্রজন্মকে।