দু’দিন আগেই কলকাতার লালবাজারে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন দুর্ধর্ষ মাওবাদী নেত্রী শকুন্তলা মাহাতো ওরফে পুষ্পা। অস্ত্র ছেড়ে মূলস্রোতে ফিরতে চেয়ে সরকারি পুনর্বাসন প্যাকেজ চেয়েছেন তিনি। এতে স্বস্তিতে প্রশাসন। শোনা যাচ্ছে তাঁকে রাজ্য পুলিশের হোমগার্ডের চাকরি দেওয়া হবে। বাংলার মানুষের কাছে শকুন্তলা মাহাতো বা পুষ্পা নামটা খুব একটা পরিচিত নয়। তবে আজও তাঁর নাম শুনলে শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায় ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার মানুষের। সাংসদকে হত্যা করে তাঁর দেহের উপরে দাঁড়িয়ে পুষ্পার পৈশাচিক উল্লাসের দৃশ্য, আজও তাঁদের অনেকের স্মৃতিতে তাজা।
সেটা ছিল ২০০৪ সালের মার্চ মাসের এক বিকেল। পূর্ব সিংভূম জেলার বাকুরিয়া গ্রামে চলছিল একটি ফুটবল ম্যাচ। প্রধান অতিথি হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জামশেদপুরের তৎকালীন সাংসদ সুনীল মাহাতো। আচমকাই সেখানে হানা দেয় অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত নকশালদের একটি দল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, এলোপাথাড়ি গুলিতে মুহূরতে মাটতে লুটিয়ে পড়েন সাংসদ, তাঁর দুই দেহরক্ষী এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (JMM) দলের আরও এক নেতা। রক্তে ভেসে গিয়েছিল ফুটবলের মাঠ, কয়েক লহমায় পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে।
তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো ঘটনাটি ঘটেছিল গোলাগুলি থামার পরে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল সাংসদ সুনীল মাহাতোর নিথর দেহ। ঠিক সেই সময়েই এগিয়ে এসেছিলেন শকুন্তলা মাহাতো।
নিষ্ঠুরতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে মাটিতে পড়ে থাকা সাংসদের রক্তাক্ত বুকের উপরে সজোরে নিজের পা তুলে দিয়েছিলেন তিনি। ওই অবস্থায় চারপাশের সেই বীভৎস রক্তপাতের মাঝেই চরম উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন শকুন্তলা। তাঁর বিকৃত, ভয়ঙ্কর হত্যা উদ্যাপন, সেখানে উপস্থিত স্থানীয় বাসিদ্নাদের মনে এক চিরস্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তা থেকে তাঁরা আজও বের হতে পারেননি।
কিন্তু কেন এই বীভৎসতা? স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেটা ছিল প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থের উল্লাস। ওই ঘটনার কিছুদিন আগেই পাশের লাঙ্গো গ্রামের বাসিন্দারা সংঘবদ্ধ হয়ে ১১ জন মাওবাদী সদস্যকে হত্যা করেছিল। সেই ঘটনার পিছনে সুনীল মাহাতোকেই দায়ী করেছিল নকশালরা আর সাংসদকে হত্যার ভয়ঙ্কর ছক কষেছিল।
শকুন্তলার এই ভয়ঙ্কর রূপে সাক্ষী ঝাড়খণ্ড হলেও তিনি আদতে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে খুব ছোটবেলাতেই মাওবাদী মতাদর্শের প্রভাবিত হয়েছিল। মাত্র ১০ বছর বয়সেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুক। গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, পুলিশকে ফাঁকি দিতে কখনও ‘বর্ষা’, কখনও ‘পরি’ ইত্যাদি ছদ্মনামে দশকের পর দশক ধরে ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা জঙ্গল এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
২০০৫ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন মাওবাদী স্কোয়াড কমান্ডার অতুল মাহাতোকে। লড়াই সংগ্রামের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর স্বামীর। অবশেষে, দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর দশ লাখ টাকা মাথার দাম থাকা সেই দুর্ধর্ষ শকুন্তলাই এখন অতীত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন। সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।