২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্লোগান ছিল ‘অব কি বার, ৪০০ পার’। কিন্তু বাস্তবে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাই (২৭২) ছুঁতে ব্যর্থ হয়, থমকে যায় ২৪০ আসনেই। জোটসঙ্গীদের নিয়ে NDA ২৯৩ আসন পেয়ে সরকার গড়লেও, বিরোধী শিবির ছিল বেশ চাঙ্গা। কিন্তু নির্বাচনের দু’বছর পরে, ২০২৬-এ বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পরেই যেন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে ‘ডমিনো এফেক্ট’।
তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের একটা বড় অংশ যেমন NDA-তে সামিল হতে আগ্রহী, তেমনই শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) থেকে শুরু করে NCP, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মতো আরও অনেক দলেই ভাঙন দেখা যেতে পারে বা গোটা দলই NDA শিবিরে সামিল হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। আর এ ভাবেই একের পর এক বিরোধী দল ভেঙে নিজেদের সাংসদ সংখ্যা ৪০০ পার না করলেও, লোকসভা ও রাজ্যসভায় সংবিধান সংশোধনীর মতো কোনও বিল পাশ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা (৩৬৩ আসন) অর্জন করে ফেলবে NDA, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অন্দরে এখন চরম ডামাডোল চলছে। লোকসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে অন্তত ২০ জন ইতিমধ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে NDA-কে সমর্থন করছেন।
দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-defection law) এড়াতে, বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘Nationalist Citizens Party of India’ বা NCPI নামে একটি ছোট দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কৌশল নিয়েছেন। রাজ্যসভাতেও সুখেন্দুশেখর রায়, কোয়েল মল্লিক, সুস্মিতা দেবের মতো বেশ কয়েকজন ঘাসফুল সাংসদ ইস্তফা দিয়েছেন।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে দল ভাঙানোর এই রাজনীতি অব্যাহত। একে বলা হচ্ছে ‘অপারেশন টাইগার’। শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এখন চরম সঙ্কটে। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে দলের সংসদীয় বৈঠকে ৯ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ৬ জনই গরহাজির ছিলেন।
ইতিমধ্যেই তাঁদের শো-কজ় নোটিস দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, তাঁদের ৬-৭ জন সাংসদ এবং ১৪-১৫ জন বিধায়ক একনাথ শিন্ডের শিবসেনায় যোগ দিতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার উদ্ধব ঠাকরে এক আবেগঘন ভিডিয়ো বার্তায় দলের সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছেন। শেষ দিন পর্যন্ত লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন। তবে এই আবেগের টানে দলীয় সাংসদ-বিধায়কদের তিনি আটকে রাখতে পারবেন বলে বিশেষ ভরসা নেই রাজনৈতিক মহলে।
শনিবারই মহারাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। যাঁকে BJP নেতাকর্মীরা আধুনিক চাণক্য বলে থাকেন। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, উদ্ধব শিবিরের বিদ্রোহী সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন তিনি।
ফাটলের ইঙ্গিত মিলেছে মহারাষ্ট্রের আরও এক শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন NCP (SP)-তেও। অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীর নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ধর্মরাও আত্রাম দাবি করেছেন, উন্নয়নের স্বার্থে শরদ পাওয়ার শিবিরের অন্তত ৫ জন সাংসদ আগামী ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁদের শিবিরে যোগ দেবেন। যদিও NCP (SP) বিধায়ক রোহিত পাওয়ার এবং সাংসদ মোহিতে-পাতিল ধৈর্যশীল রাজসিংহ এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শরদ পাওয়ারের দলের ৮ জন সাংসদ রয়েছেন। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে হলে অন্তত ৬ জনকে একসঙ্গে দল ছাড়তে হবে। অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ারের সঙ্গে দিল্লিতে অমিত শাহের বৈঠক NCP (SP)-তে ভাঙনের জল্পনা আরও বাড়িয়েছে।
তৃণমূল এবং মহারাষ্ট্রের বিরোধী দুই দলের এই রক্তক্ষরণের মাঝেই নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা বা JMM নিয়েও। সূত্রের খবর, শুক্রবার রাতেই বিশেষ বিমানে দিল্লি যাচ্ছেন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। তাঁর দলও NDA-র দিকে ঝুঁকছে বলে তীব্র গুঞ্জন এখন রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে। লোকসভায় JMM-এর ৩ জন এবং রাজ্যসভায় ২ জন সাংসদ রয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক রাজ্যসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের সঙ্গে JMM-এর ফাটল তৈরি হয়েছে।
চর্চায় রয়েছে DMK-ও। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে DMK-র সঙ্গে জোট গড়ে লড়লেও, নির্বাচনের পরে বিজয়ের দল TVK-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কংগ্রেস। যা নিয়ে হাত শিবিরের সঙ্গে DMK-র সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। কংগ্রেস ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে বলে রেজ়োলিউশন পাস হয়েছে দলের বৈঠকে। লোকসভায় তারা INDIA জোটের থেকে আলাদা ভাবে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জোটের সর্বশেষ বৈঠকেও যোগ দেয়নি। তা হলে কি DMK-ও NDA-মুখী হবে? শুরু হয়েছিল জল্পনা।
শুক্রবার অবশ্য রাহুল গান্ধীর জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছেন এমকে স্ট্যালিন। গত বছর তিনি রাহুলকে ‘আদর্শগত ভাই’ বলেছিলেন, এ বারের সম্বোধন শুধুই ‘বিরোধী দলনেতা’। তবে রাহুল কিছুটা সুর নরম করে জবাব দিয়েছেন, ‘ভারতের চেতনা, সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষার লড়াইয়ে আমরা একসঙ্গেই লড়ব এবং জিতব।’
এতে দুই পক্ষে বরফ গলার ইঙ্গিত দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, ‘অপারেশন লোটাস’-এর জেরে যখন INDIA শিবির ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে, তখন রাহুলের এই বার্তা আসলে পুরনো বিশ্বস্ত শরিক DMK-র মানভঞ্জন এবং দ্রুত মিটমাট করে নেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা।
বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয় দেখিয়ে এবং কোটি কোটি টাকার প্রলোভন দিয়ে BJP এই ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ চালাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, এর দায় এড়াতে পারে না INDIA জোট তথা কংগ্রেসও। ২০২৪ সালে INDIA জোটকে যে জনাদেশ দিয়েছিল ভারতের জনগণ, তা তারা ধরে রাখার কোনও চেষ্টাই করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
UPA জোট যে ভাবে একটি ‘কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম’ তৈরি করেছিল, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন নয়া জোটে সেই ধরনের কোনও সাধারণ কর্মসূচিই নেই। কালেভদ্রে বৈঠকে বসে এই জোট। তার মধ্যে, জোটসঙ্গীদের ধরে রাখার বিষয়ে জোটের সবথেকে বড় দল কংগ্রেসেরও উদ্যোগ ও উদ্যমের অভাব রয়েছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।
তাই মাত্র দু’বছরের মাথাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে বিরোধী ঐক্যের মিথ। আর সেই ফাঁক দিয়েই, ২০২৪-এ না পারলেও ২০২৬-এ এসে BJP-র নেতৃত্বাধীন NDA একটু একটু করে শক্তি বাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে।