• জোড়াফুলের ৩ অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় পুলিশের, তোলা যাবে না ৪৪০ কোটির কানাকড়িও
    এই সময় | ২০ জুন ২০২৬
  • এই সময়: ভাঙন–বিদ্রোহের আবহে এ বার তৃণমূ‍ল কংগ্রেসের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডেবিট ফ্রিজ় করল পুলিশ। অর্থাৎ, বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা ওই তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে আপাতত এক পয়সাও তোলা যাবে না। সূত্রের খবর, তৃণমূলের ওই তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে এই মুহূর্তে মোট ৪৪০ কোটি টাকা রয়েছে। কিছুদিন আগেই এই অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ় করার আর্জি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ককে চিঠি লিখেছিলেন তৃণমূল নেতা অরূপ বিশ্বাস। বৃহস্পতিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। শুধু তিনিই নন, তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের জনা দশেক বিধায়কও একই দাবি জানিয়ে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পুলিশ শুক্রবার ফ্রিজ় করল এবং এই পদক্ষেপ কালীঘাটের জোড়াফুল নেতৃত্বকে আরও চাপে ফেলে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। এই প্রসঙ্গে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা বিদ্রোহী তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘দুর্নীতি, কাটমানি, ডাকাতির টাকা যে ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে ঢোকে‍নি, তার কী নিশ্চয়তা আছে?’

    ‘আসল তৃণমূল’ কারা— এ নিয়ে টা‍নাপড়েন এ বার পৌঁছল দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে বিতর্কে। কিছু দিন‍ আগে লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের অন্যতম সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, এরপরে তৃণমূলের প্রতীক ও তহবিল কাদের দখলে থাকবে, তা নিয়ে আইনি লড়াই হতে পারে। বিদ্রোহী সাংসদরা আপাতত এনসিপিআইয়ে যোগ দিয়েছেন। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ বিধায়করা অবশ্য সে পথে না–হেঁটে দাবি করেছেন, তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’। কোথাকার জল কোথায় গড়াবে, সেটা আগামী দিনে বোঝা যাবে। তার আগে তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন নিয়ে অভিযোগ ও সেই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করার পদক্ষেপ সুদীপের ইঙ্গিতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও কালীঘাট–ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের পাল্টা যুক্তি, থান‍া–পুলিশ করার আগে তৃণমূলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বললে ভালো করতেন বিদ্রোহীরা।

    তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে অরূপ বিশ্বাস ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছিলেন সম্প্রতি। দলের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে অরূপ সেই চিঠি দিয়েছিলেন বলে সূত্রের দাবি। ৫ জুন সাংগঠনিক রদবদলে অরূপের বদলে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়। কিন্তু সূত্রের খবর, ব্যাঙ্কের নিয়ম মেনে এখনও তাঁকে ‘অথরাইজ়ড সিগনেটরি’ বা আর্থিক লেনদেনে সই করার অধিকারী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়নি দল। ফলে ব্যাঙ্কের কাছে খাতায়কলমে কোষাধ্যক্ষ এখনও অরূপই। দল যখন কার্যত ভেঙে গিয়েছে এবং দলের সাংগঠনিক শীর্ষকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তখন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের আর্থিক লেনদেন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে তাঁকে আইনি সমস্যায় ফেলতে পারে আন্দাজ করে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করার আর্জি জানিয়েছেন অরূপ। তার পরেই ঋতব্রতপন্থী বিদ্রোহী তৃণমূ‍ল বিধায়কদের এ নিয়ে তৎপরতা এবং পুলিশের অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ় করার পদক্ষেপ যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী বলে ম‍নে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

    বৃহস্পতিবারই একাধিক বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক বিধাননগর পুলিশের সাইবার থানায় একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের তিনটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে অভিযোগ করেন, পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেআইনি ভাবে পাওয়া অর্থ জমা রয়েছে ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টগুলিতে লেনদেন হয় জানিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ না-করলে বেআইনি লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে বিধাননগর পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ ওই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে তিনটি অ্যাকাউন্টের ডেবিট ফ্রিজ় করার নির্দেশ দিয়েছে বলে খবর।

    ওই তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মালিক কে বা কারা, তার কোনও উল্লেখ অবশ্য অভিযোগপত্রে করেননি বিদ্রোহী বিধায়করা। তবে কয়েক বছর আগে তৃণমূলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে যে তথ্য পেশ করা হয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে, তিনটির মধ্যে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নামে। অন্য দু’টি অ্যাকাউন্টের একটি দলের ত্রিপুরা শাখা এবং অন্যটি দলের গোয়া শাখার নামে নথিভুক্ত।

    অ্যাকাউন্ট–বিতর্কে এ দিন কালীঘাটপন্থী তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘থানায় অভিযোগ করার গণতান্ত্রিক অধিকার সবার আছে। কিন্তু তার আগে যে দলের প্রতীকে তাঁরা জিতেছেন, সেই দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তো একবার কথা বলতে পারতেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘তদন্ত অগ্রাধিকার, নাকি দলকে বিপাকে ফেলাটা অগ্রাধিকার, সেটা ভাবতে হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)