• ‘বলছি বাবাজীবন, আসার সময়ে মনে করে ভোটার আর আধার কার্ডটা এনো কিন্তু…’
    এই সময় | ২০ জুন ২০২৬
  • ‘কিন্তু কিন্তু’ করেও কথাটা শেষ পর্যন্ত পেড়েই ফেললেন বছর ৫৫-এর অসিত বিশ্বাস। গৌরচন্দ্রিকাটা কিঞ্চিত দীর্ঘায়িত করে বললেন, ‘ইয়ে, মানে বাবাজীবন, মেয়ে নিশ্চয় সবটাই তোমাকে বলেছে। তবুও তোমাকে একবার মনে করিয়ে দেওয়াটাও তো আমার কর্তব্য। নইলে যে মান থাকবে না! বর্ডারে বিএসএফ হেনস্থা করবে। আমরাও কিছু করতে পারব না। তাই বলছি বাবা, আসার সময়ে মনে করে ভোটার ও আধার কার্ডটা এনো কিন্তু।’ ফোনের ও-প্রান্ত থেকেও ভেসে এসেছে আশ্বাস, ‘চিন্তা করবেন না। সব গুছিয়ে রেখেছি। নিয়েই যাব!’

    ভোট দেওয়ার সময়ে লাগে। বাসে-ট্রেনে-প্লেনে টিকিট কাটার সময়েও কখনও কখনও লাগে। তাই বলে জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি যেতে হলেও ভোটার-আধার কার্ড লাগবে?

    আজ্ঞে হ্যাঁ, লাগবে বইকি! গ্রামের নাম যদি হয় চর মেঘনা। নদিয়ার করিমপুর-১ ব্লকের হোগলবেড়িয়া থানার কাঁটাতারের ও-পারের সেই গ্রামে ঢোকার আগে বিএসএফ জওয়ানদের সচিত্র পরিচয়পত্র তো দেখাতেই হবে। আউটপোস্টের রুলটানা খাতায় লিখতে হবে, বাবাজীবন ঠিক কত দিন শ্বশুরবাড়িতে থাকবেন। লেখা-কাজে গরমিল হলে আবার রক্ষে নেই। কেন? গ্রামের শেষ প্রান্ত দিয়ে বইছে তিরতিরে মাথাভাঙা। ওপারে কুষ্টিয়া, মানে বাংলাদেশ যে! যদি কোনও অঘটন…

    অতএব, শ্বশুর-শাশুড়িদের পাশাপাশি বাবাজীবনদেরও সতর্ক থাকতে হয়। চর মেঘনার বাসিন্দারা বলছেন, ‘বর্ডারে একটা চালু কথা আছে— সীমান্তে বাস সমস্যা বারো মাস। সে কথা মনে রাখতে হয় সকলকেই। পান থেকে চুন খসলেই হাজারও প্রশ্নবাণের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু, উপায়ই বা কী, আমরা যে নিজভূমেই পরবাসী!’

    কথাটা নেহাত কথার কথা নয়। করিমপুর-ডোমকল রাজ্য সড়ক থেকে কিলোমিটার চারেক এগিয়ে গেলে হোগলবেড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মেঘনা ক্যাম্প। সেখান থেকে প্রায় দু’শো মিটার দূরে কাঁটাতারের বেড়া, বিএসএফের আউটপোস্ট। সেখানে ভোটার-আধার কার্ড দেখিয়ে বিএসএফের অনুমতি মিললে তবেই খোলে পেল্লাই লোহার গেট। সেই গেট পেরিয়ে আরও দু’কিলোমিটার হতশ্রী পথ পেরোলে চর মেঘনা।

    বছর ১১ আগে, ২০১৫-এর ৩১ জুলাই উত্তরবঙ্গে ছিটমহলগুলো সীমানা ভেঙে এক হয়ে গিয়ে উৎসবের মেজাজে মেতেছিল। সে বারও চর মেঘনার ভাগ্যে সেই অর্থে শিকে ছেঁড়েনি। কারণ, সরকারি খাতায় ওই গ্রামের ‘স্টেটাস’ ছিটমহল নয়, এপিএল বা ‘অ্যাডভার্স পজেশন ল্যান্ড’। সে বার ‘ল্যান্ড ডিসপুট’ মিটলেও গ্রামবাসীদের ভোগান্তি বিন্দুমাত্র কমেনি।

    গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘এমন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ গ্রামে ছেলেদের বিয়ে পর্যন্ত হতে চায় না! মেয়েরা তো বিয়ের পরে গ্রামের বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু সাধ করে কে আর নিজের মেয়ে-বোনকে এই বন্দি-জীবনে পাঠাতে চায়, বলুন? তবে সবচেয়ে মান-সম্মানে পড়তে হয় এই জামাইষষ্ঠীর সময়ে।’ ঠিক কী ঘটে?

    কাঁটাতারের বেড়ার এক দিকে সপরিবার অপেক্ষায় থাকেন বাবাজীবন। হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি, বড় মাছ, ব্যাগপত্তর আর ভোটার ও আধার কার্ড। অন্য দিকে, অপেক্ষায় থাকেন শ্বশুর, শ্যালক কখনও কখনও শাশুড়ি। কর্তব্যে অবিচল তারকাঁটার বেড়াও সাক্ষী থাকে এক অদ্ভুত কথোপকথনের,

    —তো ইয়ে হ্যায় আপকা কার্ড…আচ্ছা… আপ কিসকে দামাদ হ্যায়?

    — (বাবাজীবন কিছু বলার আগেই ও-প্রান্ত থেকে ভেসে আসে) ও সাহেব, ও আদমি মেরা জামাই হ্যায়। কাগজপত্রও সব ঠিক হ্যায় …

    —কিতনে দিন রহেঙ্গে?

    —(ফের ও প্রান্ত থেকে) সাহেব, দো-তিন দিন…

    —দো ইয়া তিন?

    —(ও প্রান্ত থেকেই) তিন, তিন ফাইনাল স্যর।

    অবশেষে খুলে যায় লোহার গেট। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেজারমুখে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে পা বাড়ান বাবাজীবন।

    ষষ্ঠী, অরণ্যষষ্ঠী কিংবা জামাইষষ্ঠী নিয়ে কাব্য, সাহিত্য নেহাত কম নেই। জামাইষষ্ঠী পালনে বেশ ইতিবাচক মনোভাব ছিল খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও। ১৯৩১-এর ১১ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল অমর চৌধুরী পরিচালিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্যের সবাচ চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’। কৃপণ শ্বশুর কুবের ও তাঁর নিরীহ জামাই শ্রীধরকে নিয়ে সে এক অন্য গল্প। অধুনা এ পার বাংলার পদ্মা ইলিশের ব্যাপারে কৃপণ হলেও চর মেঘনা কিন্তু জামাই-খাতিরের ব্যাপারে যথেষ্ট সদয়। অভাবের সংসারেও আয়োজনে-আন্তরিকতায় কোনও খামতি থাকে না। কিন্তু পদে পদে বাধ সাধে সীমান্তের রাঙাচোখ আর ভারী বুটের অনুশাসন। বিএসএফের এক কর্তার কথায়, ‘আন্তর্জাতিক সীমান্ত। নিয়ম তো মানতেই হবে।’

    চর মেঘনার বাসিন্দা, করিমপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন কর্মাধ্যক্ষ, গোয়াবাড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক উত্তম সর্দারের কথায়, ‘আমাদের এ সমস্যা বহু পুরোনো। প্রশাসন, বিধায়ক, সাংসদকে কত বার জানিয়েছি, কাঁটাতারের বেড়াটা গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকলেই সব ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু সে আর হচ্ছে কই?’ যা শুনে করিমপুরের বিধায়ক বিজেপির সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ বলছেন, ‘চর মেঘনার সমস্যা কোনও ভাবেই অস্বীকার করা যায় না। নো ম্যানস ল্যান্ডের নিয়ম মেনে কাঁটাতারের বেড়া যাতে গ্রামের শেষ প্রান্ত দিয়ে করা হয় সে ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব ও প্রশাসনের সব স্তরে জানানো হয়েছে। আশা করি, শিগ্‌গির ওই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

    ‘যস্মিন দেশে যদাচার’ শিরোধার্য করেই চর মেঘনায় জামাইষষ্ঠীতে আসছেন বর্ধমানের সুমন মাহাতো, রায়নগরের অনিমেষ বিশ্বাস। তাঁদের কথায়, ‘যত তাড়াতাড়ি সমাধান হয়, ততই মঙ্গল!’

    সত্যিই তো, জামাইষষ্ঠী কি মুখের কথা!

  • Link to this news (এই সময়)