• মা-কাকিমাদের হাতে তৈরি গয়না বড়ির জনপ্রিয়তা হোক বিশ্বজনীন, ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের প্রস্তুতি শুরু
    এই সময় | ২০ জুন ২০২৬
  • সাউথ জামাইকার সুপারমার্কেটে ঢুকে সকালের বাজারটি সেরে নিচ্ছেন। তাজা সব্জি, কর্নব্রেড, সসেজ, বাটার মিল্কের প্যাকেটে ব্যাগ প্রায় ঠাসা। হঠাৎই চোখ গেল স্পাইসেস-এর কাউন্টারের এক কোণায়। এটা কী? শীতের মিঠেকড়া রোদে ছাদে শুকিয়ে মা-কাকিমাদের হাতে তৈরি করা গয়না বড়ির প্যাকেট। ভাত, ধোঁয়া ওঠা ডাল, এক চামচ বিশুদ্ধ ঘিয়ের সঙ্গে কয়েকটা গয়না বড়ি বাঙালির পাতে অন্যতম ‘ক্রিস্প এলিমেন্ট’। সেই বড়ি প্যাকেটজাত হয়ে মিলবে সুদূর আমেরিকাতেও? ভিনদেশিরাও পাবেন বাঙালির এই অভিজাত খাবারের স্বাদ? দিন গোনা শুরু করে দিন। বাঙালির পাতে সাজানো এক টুকরো ‘গ্রাফিক আর্ট’ এ বার বিশ্বজনীন হওয়ার পথে।

    কলাই বা বিউলির ডাল পেশাই করে বিভিন্ন নকশার আকার দিয়ে তৈরি হয় এই গয়না বড়ি। ফুল, পাতা, প্রজাপতি, পেঁচা, ময়ূর, মাছ ইত‍্যাদি নানা আকারের নকশা তৈরি করা হয়। এর পরে একটা থালায় পোস্ত ছড়িয়ে বড়িগুলোকে রোদে শুকানো হয়। বিগত দিনে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে আচার, বড়ি তৈরির প্রথা ছিল। সেটা এখন অনেকটাই পড়তির দিকে। তবে বিভিন্ন জেলায়, বিশেষত পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীই বড়ি তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সেই বড়িকেই এ বার ‘ব্র্যান্ড বড়ি’ তৈরি করার চেষ্টায় জেলা প্রশাসন।

    মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, ‘গয়না বড়ি নিয়ে এই প্রথম আমরা ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজ়িংয়ের দিকে এগোচ্ছি। এর জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের সাহায্য নেওয়া হবে। জেলায় এরকম ১০০টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছি। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে মহিলারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। গয়না বড়ি তৈরি হওয়ার পরে তা কেনার দায়িত্ব স্বনির্ভর গোষ্ঠীর। প্রত্যেকটা বড়ির মাপ, গুণগত মান হলদিয়ার একটি ল্যাবরেটরিতে টেস্ট হবে।’ এই গয়না বড়ি প্রবাসীদের হাত ধরে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন শপিং মল, কেনাকাটার জায়গা, মেলায় এই গয়না বড়ি পাঠানোর চেষ্টা করব।

    শুধু দেশে-বিদেশে পাঠানোই নয়, সুন্দর প্যাকেটজাত করে উপযুক্ত ‘প্রোডাক্ট ব্র্যান্ডিং’-এর ব্যাপারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। মূলত মহিষাদল ব্লকে গয়না বড়ি বেশি উৎপন্ন হলেও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক, নন্দকুমার, খেজুরি-সহ বেশ কিছু এলাকায় এখন গয়না বড়ি তৈরি করে এলাকার মানুষ স্বনির্ভর হচ্ছেন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল ব্লকের প্রায় ১১টি অঞ্চল যথাক্রমে নাটশাল-১, নাটশাল-২, বেতকুণ্ডু, লক্ষ্যা-১ ও ২-সহ অন্যান্য অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ গয়না বড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে গয়না বড়ির ব্যবসা করছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে গয়না বড়ি তৈরি করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। মহিষাদল ব্লকের গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বনাথ গোস্বামী বলেন, ‘রসগোল্লার মতো বাংলার গয়না বড়িও সুখ্যাতি অর্জন করেছে। দেশ-বিদেশে চাহিদা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। গ্রাম বাংলার মহিলারা গয়না বড়ি তৈরি করে আজ স্বনির্ভর।’

    পাশাপাশি এই গয়না বড়ির জিআই ট্যাগ পাওয়ার ব্যাপারেও চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। গেঁওখালি কো-অপারেটিভের সম্পাদক পূর্ণেন্দুশেখর জানা বলেন, ‘এলাকার গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভর করার জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০০ মহিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ স্বনির্ভর হয়েছেন। জেলার গয়না বড়ি যাতে GI স্বীকৃতি লাভ করতে পারে, তার চেষ্টায় আমরা প্রশাসনের নিকট সমস্ত কিছু জমা করেছি।’

    সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি, উৎসব অনুষ্ঠান, মেলা প্রভৃতিতে বিভিন্ন সামগ্রীর পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। সেখানেও দেদার বিক্রি হয় গয়না বড়ি। তবে হাটে, মাঠে বা মেলায় এই বড়ি বিক্রি হলেও বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এই প্রোডাক্টকে বিশ্বজনীন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

    তথ্য সহায়তা: রঞ্জন মাইতি, নিতাই মাইতি

  • Link to this news (এই সময়)