আর্থিক অনটনে শেষ হয়নি ইঞ্জিনিয়ারিং, অদম্য জেদে সেনার লেফটেন্যান্ট পদে গুসকরার তরুণ
প্রতিদিন | ২১ জুন ২০২৬
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্সে গণ্ডিও পেরিয়ে ছিলেন। দু’বছর পারও করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। কিন্তু বাবা বেসরকারি একটি হিমঘরের সামান্য বেতনের কর্মচারী। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা সম্পূর্ণ হয়নি। আর তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও ভেঙে পড়েনি তাঁর সাফল্যের শিখরে উঠার স্বপ্ন। অসম্ভব মেধাশক্তি আর অদম্য জেদেই পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরা শহরের বাসিন্দা ২৮ বছরের তরুণ চিরঞ্জিত বন্দোপাধ্যায় ইউপিএসসি স্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভারতীয় সেনার লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দিয়েছেন। সামান্য হাবিলদার থেকে লেফটেন্যান্ট পদে চিরঞ্জিতের এই উত্তরণে গর্বিত গুসকরাবাসী। একসপ্তাহের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন চিরঞ্জিত। তাঁকে শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিচ্ছেন এলাকাবাসী। বর্তমানে তিনি শিখ রেজিমেন্টের একজন শীর্ষ সেনা আধিকারিক। বদলি হয়ে আগামী সপ্তাহেই রাঁচিতে তিনি যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন লেফটেন্যান্ট চিরঞ্জিত।
গুসকরা শহরের ধারাপাড়া এলাকার বাসিন্দা উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় ও বকুলদেবীর এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে শিউলিদেবী বিবাহিতা। একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। উৎপলবাবু স্থানীয় একটি বেসরকারি হিমঘরে জেনারেটরম্যানের কাজ করতেন। অনেক কষ্ট করেই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হত। চিরঞ্জিত ছোট থেকেই মেধাবী। পড়াশোনাতেও ছিলেন ভালো। বাড়ির আর্থিক অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও ২০১৩ সালে গুসকরা পি পি ইন্সটিটিউশন থেকে বিজ্ঞান বিভাগে শতকরা ৭৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাশ করেন। সেইবছর জয়েন্ট এন্ট্রান্সে উত্তীর্ণ হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। চিরঞ্জিত জানিয়েছেন, দু’বছর তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর আর্থিক সঙ্গতিতে কুলায়নি। তখন সেনাবাহিনীর পরীক্ষা দিয়ে ২০১৫ সালে হাবিলদার পদে যোগ দেন।
চিরঞ্জিতের কথায়, ” হয়তো একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উচ্চপদে চাকরি করতাম। কিন্তু আর্থিক কারণে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটলেও সেটাকে ব্যর্থতা হিসাবে ধরিনি। বরঞ্চ জীবনকে শিক্ষা হিসাবেই গ্রহণ করেছিলাম। তাই চাকরিরত অবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছি। এরপর ২০২২ সালে এসএসবি পরীক্ষায় পাশ করে ইণ্ডিয়ান মিলেটারি অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পাই। চারবছরের কোর্স সম্পূর্ণ করে এই মাসের ১৩ জুন একজন লেফটেন্যান্ট হিসাবে উত্তীর্ণ হয়েছি।” কয়েকদিন আগেই মিলেটারি অ্যাকাডেমির আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে সংশাপত্র গ্রহণ করেন চিরঞ্জিত।
চিরঞ্জিতের এই সাফল্যের খবর বাড়িতে পৌঁছাতেই আনন্দে চোখে জল উৎপলবাবু, বকুলদেবীদের। গুসকরা শহরবাসী তাঁকে শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিচ্ছেন। এদিন শনিবার গুসকরার বাসিন্দা সমাজকর্মী পাঞ্জাব শেখ তাঁকে বাড়িতে গিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসেন। চিরঞ্জিত বলেন, ”আমার এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার বাবা, মা-সহ পরিবারের। যেসব ছাত্রছাত্রী সেনাবাহিনীতে যোগদানের লক্ষ্য এগোনোর চেষ্টা করছে তাঁদের উদ্দেশ্যে বলব, প্রথম দফায় ব্যর্থ হলে সেটাকে শিক্ষা হিসাবে নিয়ে পরের ধাপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। হতাশ হলে হবে না। চেষ্টা থাকলে সাফল্য আসবেই।”