• ‘ফিরিয়ে দাও আমার সেই…’, খুনের অভিযোগে ৪৩ বছর জেল খাটার পরে বেকসুর খালাস
    এই সময় | ২১ জুন ২০২৬
  • 'দাও, ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও, আমার সেই বারোটা বছর!’ এজলাসে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় হাহাকার করছেন একজন অসহায় বৃদ্ধ। গোটা আদালতে কারও মুখে কোনও কথা নেই। শুধু চোখের বাঁধ ভেঙে বইছে জল। ‘সবার উপরে’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য ও বিখ্যাত সংলাপের ভোলার নয়। ছবি বিশ্বাস অভিনীত সেই চরিত্র মিথ্যে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১২ বছর ছিলেন জেলবন্দি। তার পরে আইনজীবী ছেলের প্রচেষ্টায় নির্দোষ প্রমাণিত হন তিনি। বেকসুর খালাস ঘোষণা করেন বিচারক। কিন্তু সে রায় শুনে, জীবনের দুর্মূল্য দীর্ঘ বারোটা বছর জেলে কাটিয়ে ফেলা বাবা হাহাকার করে উঠেন। এরকমই পরিস্থিতি ফিরে এল দিল্লি হাইকোর্টে। খুনি হিসেবে ৪৩ বছর জেল খাটার পরে বেকসুর মুক্তি পেলেন এক ব্যক্তি।

    চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক খুনের মামলায় অবশেষে বড় স্বস্তি পেলেন এক ব্যক্তি। ১৯৮৩ সালের একটি খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রায় ২২ বছর পর এবং এফআইআর দায়েরের ৪৩ বছর পর দিল্লি হাইকোর্ট অভিযুক্ত মুকেশ কুমারকে খালাস দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

    মামলার সূত্রপাত ১৯৮৩ সালের ১ ডিসেম্বর। দিল্লির লাজপত নগর থানায় একটি এফআইআর দায়ের হয়। অভিযোগ ছিল, একটি ডিটিসি বাসে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় বিনোদ নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় এবং আরও দু’জন ব্যক্তি, উষা ও অশোক কুমার—আহত হন। তদন্তের পরে মুকেশ কুমার-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

    দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পরে ২০০৪ সালে পাটিয়ালা হাউস আদালত মুকেশ কুমারকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (খুন) ও ৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনায়। পরে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি। ২০০৫ সালে তাঁর সাজা স্থগিত করা হয়।

    সম্প্রতি বিচারপতি নবীন চাওলা এবং বিচারপতি রবীন্দর দুদেজার ডিভিশন বেঞ্চ মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পুনর্বিবেচনা করে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। আদালত জানায়, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখানো যায়নি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অভিযুক্তের অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণ বা অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল। তাই অভিযুক্তকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ বা সন্দেহের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

    রায়ে আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করে, ঘটনার সময় বাসের কন্ডাক্টরের সাক্ষ্য অভিযোগপক্ষের বক্তব্যকে পুরোপুরি সমর্থন করেনি। সাক্ষী দাবি করেননি যে তিনি অভিযুক্তকে হামলা চালাতে দেখেছেন। আদালত আরও বলে, ঘটনাস্থলে কথিতভাবে উচ্চারিত উস্কানিমূলক মন্তব্যকে সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।

    হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অপরাধমূলক মামলায় কেবল সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না; অভিযোগকে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রমাণ করতে হয়। সেই মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় নিম্ন আদালতের ২০০৪ সালের দোষী সাব্যস্ত করার নির্দেশ বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় এফআইআর দায়েরের ৪৩ বছর পর খালাস পেলেন খুনে অভিযুক্ত মুকেশ কুমার।

  • Link to this news (এই সময়)