একাই গড়েছেন দল, নেই ক্লাব, এক ম্যাচে ১৫ সেভ করে নায়ক কুরাসাওয়ের গোলকিপার
এই সময় | ২১ জুন ২০২৬
৪৮ দলের বিশ্বকাপের দলগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর যেই দেশগুলোর দিকে সকলের নজর ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম কুরাসাও। ১ লাখ ৬৫ হাজার জনসংখ্যা বিশিষ্ট ডাচদের নিয়ন্ত্রণাধীন এই দ্বীপরাষ্ট্র বিশ্বকাপের শুরুটা খারাপ করেছে। জার্মানির সামনে দাঁড়াতেই পারেনি তারা। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই ছবিতে বদল। আমেরিকার কাননসাস সিটির স্টেডিয়ামে শনিবার রাতে যা ঘটল, তা শুধু একটি গোলশূন্য ড্র নয়; বরং একটি ছোট্ট দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের অধ্যায়। বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ইকুয়েডরের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ০-০ ব্যবধানে ড্র করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের পয়েন্ট অর্জন করেছে কুরাসাও। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন গোলকিপার এলয় রুম।
৩৭ বছর বয়সি এই গোলকিপার পুরো ম্যাচে ১৫টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ আটকে দিয়ে বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড গড়লেন। বিশ্বকাপের রেকর্ড রাখা শুরু হয় ১৯৬৬ সাল থেকে। সেই সময় থেকে কোনও গোলকিপার ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে এতগুলো সেভ করতে পারেননি। ২০১৪ সালে আমেরিকান গোলকিপার টিম হাওয়ার্ড বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ১৫টা সেভ করেছিলেন, তবে সেটা ৯০ মিনিটে নয়। অতিরিক্ত সময়ে। সেই হিসেবে দেখলে এলয় রুম ৯০ মিনিটে করলেন ১৫টা সেভ। বিশ্বকাপের মঞ্চে যেখানে প্রতি মুহূর্তে অ্যাসিড টেস্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সেখানে শক্তিশালী দলের ১৫টা সেভ আটকে দেওয়া মুখের কথা নয়। তাও এমন একজন গোলকিপার যাকে শনিবারের আগে কেউ চিনতেন না।
শক্তি যখন আত্মবিশ্বাস
এলয় রুমের এই সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাসের গল্প কুরাসাও ফুটবল মহলে অনেকদিন ধরেই রয়েছে। যেমন ২০২৫ সালে জামাইকার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শেষ মুহূর্তে প্রতিপক্ষ পেনাল্টি পায়। তখন এলয় রুম রেফারিকে বলেছিলেন, ‘পেনাল্টি দিলেও সমস্যা নেই, আমি সেটি বাঁচাবই।’ তাঁর এই চ্যালেঞ্জ শুনে কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন রেফারি। পরে অবশ্য VAR সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। ফলে তিনি আর সেই চ্যালেঞ্জ প্রমাণের সুযোগ পাননি।
কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস তিনি ইকুয়েডরের বিপক্ষে দেখান। ম্যাচ জুড়ে একের পর এক আক্রমণ সামলে কুরাসাওকে এনে দেন অমূল্য এক পয়েন্ট।
ছোট্ট দ্বীপ থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে
মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও ২০১১ সালে ফিফার সদস্যপদ পায়। সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই শুরু হয়। সেই পথচলার অন্যতম অগ্রদূত এলয় রুম।
নেদারল্যান্ডসের বয়সভিত্তিক দলে খেলার সুযোগ পেলেও সিনিয়র জাতীয় দলে ডাক না পেয়ে ২০১৫ সালে কুরাসাওয়ের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সে সময় দলের কোচ ছিলেন নেদারল্যান্ডসের প্রাক্তন তারকা প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট। ব্যক্তিগতভাবে রুমকে ফোন করে দলে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন তিনি।
রুম শুধু নিজে দলে যোগ দেননি, বরং ইউরোপে খেলা কুরাসাও বংশোদ্ভূত ফুটবলারদেরও জাতীয় দলে আসতে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকে কুরাসাও।
ক্লাবহীন থেকেও হার মানেন নি
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ দিকে এলয় রুমের ক্লাবও ছিল না। ডাচ ক্লাব ভিটেসের আর্থিক সংকট এবং পরে বেলজিয়ামের সের্কল ব্রুজে স্বল্প সময় কাটানোর পর তিনি কার্যত বেকার হয়ে পড়েন। কিন্তু থেমে যাননি।
জিমে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ, আলাদা গোলকিপার কোচের তত্ত্বাবধান এবং ফিটনেস ধরে রাখতে নিয়মিত প্যাডেল খেলে নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিলেন তিনি। সেই কঠোর পরিশ্রমের ফলই মিলেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
জার্মানির কাছে ৭ গোল খাওয়ার পর প্রত্যাবর্তন
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে বড় ধাক্কা খেয়েছিল কুরাসাও। তবে সেই ম্যাচেও রুম আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছিলেন। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে তিনি যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করলেন।
ইকুয়েডর পুরো ম্যাচে ২৮টি শট নেয়, যার ১৫টি ছিল গোলে। কিন্তু প্রতিবারই সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রুম। ম্যাচের শুরুতেই এননার ভ্যালেন্সিয়ার নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, দিনটি তাঁরই হতে চলেছে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়রা উল্লাসে ফেটে পড়েন। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্টের আনন্দে মেতে ওঠে পুরো দল। হাজার মাইল দূরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপেও শুরু হয় উদযাপন।
এলয় রুমের ১৫ সেভ শুধু একটি রেকর্ড নয়, এটি একটি দেশের স্বপ্নপূরণের প্রতীক। বহু বছরের সংগ্রাম, বিশ্বাস এবং আত্মত্যাগের ফলাফল। আর সেই কারণেই ক্যানসাস সিটির রাতটি কুরাসাও ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।