২০২৫ সালের ১২ মাসে যেখানে ভারত ছেড়েছিল ১৮.৪ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা) বিদেশি লগ্নি, সেখানে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে মার্চের শুরু থেকে ধরলে পরের সাড়ে তিন মাসে দালাল স্ট্রিট থেকে কমবেশি ৩৪.৫ বিলিয়ন ডলারের (২.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা) বিনিয়োগ ‘নিরাপদ’ গন্তব্যে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। যা প্রবল চাপ তৈরি করেছে দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ার এবং ডলারের নিিরখে টাকার দরের উপর। মধ্যে যুদ্ধের আঁচ যখন গনগনে, তখন একসময় ডলারের দর প্রায় ৯৭ টাকা ছুঁইছুঁই হয়ে যাওয়ায় মনে করা হচ্ছিল তা সেঞ্চুরি ছুঁয়ে ফেলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। যে পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মজুত ভাঁড়ার থেকে আপৎকালীন ভিত্তিতে ডলার বিক্রি করার পাশাপাশি নিলামের মাধ্যমে ব্যাঙ্কগুলির থেকে ৫০০ কোটি ডলার কেনায়, পারদ কিছুটা নিম্নগামী হয়েছে।
কিন্তু শীর্ষ ব্যাঙ্কের তরফে টাকার দরে পতন ঠেকানোর জন্য শুধু ডলার বিক্রি বা নিলাম যে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে না, তা বুঝে বিদেশি বিনিয়োগ ভারতে টানতে একাধিক পদক্ষেপ করেছেন আরবিআই কর্তৃপক্ষ। যার অন্যতম হলো দেশের ব্যাঙ্কগুলিকে নতুন ফরেন কারেন্সি নন-রেসিডেন্ট (ব্যাঙ্ক) ডিপোজ়িট (এফসিএনআর (বি) নিতে অনুমতি দেওয়া। একই সঙ্গে ব্যাঙ্কগুলিকে বলা হয়েছে ফরেন কারেন্সি নন-রেসিডেন্ট (ব্যাঙ্ক) অ্যাকাউন্টে সুদের হার আরও আকর্ষণীয় করতে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে একটাই লক্ষ্য, দেশে ডলারের লগ্নি-বন্যা বইয়ে দেওয়া।
এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িট কী?
ফরেন কারেন্সি নন-রেসিডেন্ট (ব্যাঙ্ক) ডিপোজ়িট বলতে বোঝায় এক বিশেষ ধরনের ফিক্সড ডিপোজ়িট’কে, যেখানে নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা ওভারসিজ় সিটিজ়েন্স অফ ইন্ডিয়া (ওসিআই)-রা তাঁদের আয় বিদেশি মুদ্রায় (ডলার/পাউন্ড/ইউরো ইত্যাদি) ভারতীয় ব্যাঙ্কে জমা রাখতে পারেন। যে ডিপোজ়িট থেকে প্রাপ্ত সুদের উপর ভারতে কোনও আয়কর নেওয়া হয় না। পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে ভারতে জমা থাকা এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িট-এর পরিমাণ বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। যে পরিস্থিতি শুধরাতে মাঠে নেমেছে আরবিআই।
কী সুবিধা মিলবে?
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সবথেকে বড় সুবিধা হলো, আরবিআই কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যাঙ্কগুলির তরফে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া ৩-৫ বছরের সব নতুন এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িট-এর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ‘হেজ়িং কস্ট’ বহন করবেন তাঁরা। যার ফলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের মাথায় থাকা ফরোয়ার্ড কভার হেজ়িং কস্ট-এর বোঝা কমে যাওয়ায়, তাঁরা খোলা মনে আরও আকর্ষণীয় রেটে সুদ ‘অফার’ করতে পারবেন অনাবাসী ভারতীয়দের।
বর্তমানে হেজ়িং ফরোয়ার্ড প্রিমিয়াম কস্ট প্রায় ৩.৫%। যেহেতু আরবিআই এই বোঝা নিজের পকেট থেকে বইতে রাজি হয়ে গিয়েছে, তাই ব্যাঙ্কগুলির তরফে বর্তমান হারের থেকে ২০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত সুদ বাড়িয়ে ৭-৭.১০% পর্যন্ত হারে রিটার্ন দেওয়া সম্ভব হবে নতুন এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িটে, দাবি বিশেষজ্ঞদের। এই সুযোগ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিদেশি মুদ্রার ওভারনাইট অল্টারনেটিভ রেফারেন্স রেট বা সোয়্যাপ রেটের সঙ্গে সর্বাধিক ৩৫০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত সুদ দিতে পারত ব্যাঙ্কগুলি।
আকর্ষণীয় কেন?
অঙ্কে ফিরুন। ধরুন আপনি নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা ওভারসিজ় সিটিজ়েন্স অফ ইন্ডিয়া (ওসিআই)। হিসেবের স্বার্থে ধরে নিন ডলারের বর্তমান দর ৯৪.৫০ টাকা এবং ১-ইয়ার ফরোয়ার্ড রেট ৯১.৫০ টাকা। এবং এফসিএনআর (বি) ইন্টারেস্ট রেট ৪.৪০%।
সেক্ষেত্রে ১ লক্ষ ডলার যদি আপনি এখন এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িট করেন, সেক্ষেত্রে আপনার ম্যাচিওরিটি অ্যামাউন্ট হওয়ার কথা ১,০৪,৪০০ ডলার। যে টাকা আপনাকে ব্যাঙ্ক ১ বছর পর পূর্ব নির্ধারিত ফরোয়ার্ড রেট ৯১.৫০ টাকা/ডলার হিসেবে ৯৫,৫২,৬০০ দিয়ে দেবে।
কিন্তু আপনি যদি প্রথম দিনই ১ লক্ষ ডলার টাকায় ভাঙিয়ে নিয়ে রাখতে চাইতেন, সেক্ষেত্রে আপনার লগ্নি হতো ৯৪,৫০,০০০ টাকা। আর এফেক্টিভ রিটার্ন নেমে আসত ১.০৮%। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক ৩-৩.৫% হেজ়িং কস্ট নিজে দিয়ে দেওয়ায় ব্যাঙ্কগুলির জন্যও বোঝা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
ব্যাঙ্কগুলি কী ভাবছে?
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ঘোষণার পরেই দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ তাঁদের এসবিআই অ্যাডভান্টেজ এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িট স্কিম নিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন। যেখানে পাঁচ বছরের জন্য ১ মিলিয়ন ডলার লগ্নির ক্ষেত্রে সর্বাধিক ৬% হারে রিটার্ন দেওয়া হবে। সুদ বাড়ানো হয়েছে অন্য মেয়াদের আমানতেও।
এর পাশাপাশি এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, কারুর বৈশ্য ব্যাঙ্ক, এইউ স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক-সহ একাধিক ব্যাঙ্কের তরফেও এফসিএনআর (বি) ডিপোজ়িটে সুদ বাড়ানো হয়েছে।
২০১৩’র থেকে সুবিধা বেশি?
বর্তমানে সমস্ত ডিপোজ়িট-এর লক-ইন পিরিয়ড মাত্র ১ বছর। ফলে তারপরেই প্রিম্যাচিওর উইথড্রয়াল করতে পারবেন লগ্নিকারীরা। এখন ব্যাঙ্কগুলি ৩-৫ বছরের মেয়াদে আমানত নিতে পারেন, যেখানে ২০১৩ সালে শুধু ৩ বছরের মেয়াদি আমানত নিতে দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছর আগের ডিপোজ়িট রিনিউ এবং নতুন ডিপোজ়িটে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ২০১৩ সালে শুধুমাত্র ফ্রেশ ডিপোজ়িটেই তা পাওয়া যাচ্ছিল।