রঞ্জন মাইতি
গত কয়েক বছরে লাফিয়ে বেড়েছে দিঘায় পর্যটকের সংখ্যা। সারা বছরই পর্যটকের ভিড়। বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত, সমুদ্র স্নান তো আছেই, এখন দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরও হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক বিনোদন পার্ক রয়েছে ওল্ড দিঘা, নিউ দিঘায়। সব মিলিয়ে দু’তিনদিনের ছোট্ট ট্যুর সেরে নিলে মনও খুশ, পয়সাও উসুল। কিন্তু দিঘায় পর্যটক যেমন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনাও। শনিবারই স্পিড বোটের ধাক্কায় এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। বছর তিনেক আগে স্পিড বোটের তলায় পড়ে এক পর্যটক গুরুতর জখম হয়েছিলেন। বার বার প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তা হয়নি বলেই অভিযোগ। সে কারণেই কি এই দুর্ঘটনা? উত্তর খুঁজল এই সময় অনলাইন।
শনিবার সকালে দিঘা মোহানা থানা এলাকার সি-হক ঘোলাঘাটে স্পিড বোটের ধাক্কায় মৃত্যু হয় পূর্ব বর্ধমানের যুবক শেখ বাপনের। মৃত্যুর ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন। তদন্তের স্বার্থে অনির্দিষ্টকালের জন্য দিঘার সমুদ্রে ব্যবহৃত সমস্ত ওয়াটার স্পোর্টস সংক্রান্ত নানা সরঞ্জাম নামানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন।
২০২২ সালে দিঘায় পাঁচ জন পর্যটক নিয়ে বোটিংয়ের সময়ে স্পিড বোটটি খারাপ হয়ে পড়ে মাঝ সমুদ্রে। সেখানেই আটকে পড়েন পর্যটকরা। তড়িঘড়ি প্রশাসন তৎপর হয়ে উদ্ধারও করে। ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর স্পিড বোটের ধাক্কায় আহত হয়েছিলেন কলকাতার এক পর্যটক। যদিও বরাত জোরে প্রাণে বাঁচেন। তবে ২০২৬-এর ২০ জুন স্পিড বোটের ধাক্কা প্রাণ কাড়ল পর্যটকের।
প্রশ্ন উঠছে, স্পিড বোট, বানানা বোট, প্যারাসেলিং, স্পিড বাইকের মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, ওয়াটার স্পোর্টসই কি বিপদ বাড়াচ্ছে সমুদ্রতটে? এই ধরনের রাইড পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে বেসরকারি সংস্থার হাতে। প্রশ্ন হলো, তারা কি ঠিক মতো দেখভাল করে? সকলের বৈধ কাগজপত্র আছে? প্রশাসন নজর রাখে?
জানা গিয়েছে, দিঘায় বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এই পরিষেবা দেয়। যদিও সকলের বৈধ কাগজপত্র আছে কি না তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। দিন দিন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসও জনপ্রিয় হচ্ছে বাঙালির প্রিয় এই ভ্রমণকেন্দ্রে। নিয়ম অনুযায়ী পযটন দপ্তর থেকে অনুমতি করিয়ে DSDA-এর থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা সংস্থা গুলির রয়েছে কি না, তা ঠিক মতো যাচাই করা হয় না বলে অভিযোগ।
দিঘার সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশাসন তৎপর হয়। এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, তার পরে সে ভাবে প্রশাসনিক নজদারি থাকে না। সাধারণত যে ধরনের বিচে এই জিনিস থাকা উচিত, দিঘা সে রকম নয়। পাশাপাশি ভিড়ের মধ্যেই এ সব চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা নিতাই দাস, স্থানীয় ফটোগ্রাফার অনীক মাইতি মানছেন, যখন সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঘটে তার কয়েক দিন প্রশাসন তৎপর থাকে। তার পরে যেই কে সেই! আমরা চাই, এই সব ওয়াটার রাইডের ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট সীমানা ঠিক করে দেওয়া হোক। তার মধ্যেই সে সব ঘোরাফেরা করবে। সেগুলি ফাঁকা এলাকায় থাকুক। অনেক সময়ে সেগুলি মানুষের ভিড়ে ঢুকে পড়ে। আর তাতেই বড়সড় বিপদ ঘটে যায়।
২০২৩ সালে কলকাতার পর্যটক স্পিড বোটের ধাক্কায় আহত হওয়ার পরেই তৎকালীন যিনি জেলাশাসক, তিনি বলেছিলেন,‘স্পিড বোট ফাঁকা জায়গায় চালাতে হবে। ভিড় জায়গায় কোনও বেই এই জিনিস চলবে না। পর্যটকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাকে আমরা সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’ অথচ এখনও সেই নিয়মে কড়াকড়ি করা গেল না?
শনিবারের ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাঁথির মহকুমা শাসক ধুমল প্রতীক অশোক। পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা জানিয়েছেন, স্পিড বোটটি সিজ় করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে। আগামিদিনে আরও নজদারি বাড়ানো হবে।
রামনগরের বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে অনেক অনিয়ম হয়েছে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী অনিয়ম কোনও ভাবেই বরদাস্ত করবেন না। কোন কোন সংস্থা এই সব রাইডের দায়িত্বে, তার রিপোর্ট চেয়েছি। যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেওয়া হবে।’
দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার অবশ্য বলেছেন, ‘আমরা সংস্থার নামে FIR করেছি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত এ সব কিছু বন্ধ থাকবে। সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখে, তার পরে আবার নতুন করে এ সব চালু হবে।’
সম্প্রতি দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই বৈঠকে দিঘাকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তুলতে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা সবার আগে। সূত্রের খবর, সে দিকে নজর দিয়েও একাধিক পদক্ষেপ করতে চলেছে প্রশাসন।