এই সময়: তৃণমূলের দলীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করা নিয়ে চর্চার মধ্যেই শুরু হয়ে গেল তার ‘অ্যাকাউন্টিবিলিটি’ নিয়ে তরজা।
শনিবারই দলের লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র জানিয়েছিলেন, তৃণমূলের যে ‘বিতর্কিত’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, সেখান থেকেই সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা ভোটে লড়ার জন্য দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যেককে ২৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। তার ঠিক পরের দিন, রবিবারই নির্বাচন কমিশনের নথি তুলে ধরে তৃণমূলের দাবি, রাজ্যে পালাবদলের পরে গঠিত নয়া বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডেপুটি লিডার সন্দীপন সাহাও তৃণমূলের ওই বিতর্কিত অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ লক্ষ টাকা করে পেয়েছেন। দু’জনেই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি করছেন এবং তাঁরাই দলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্যতম দুই প্রধান মুখ। ফলে তৃণমূলের ‘ফ্রিজ়ড’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ঘিরে দাবি–পাল্টা দাবিতে দলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তরজাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ভোট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে সব প্রার্থীকেই নির্বাচনী খরচের হিসেব জাতীয় নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের দুই জয়ী বিধায়ক ঋতব্রত–সন্দীপন কমিশনে খরচের যে হিসেব জমা দিয়েছেন, সেই নথির প্রতিলিপি তুলে ধরেই দলের মুখপাত্র তথা এখনও কালীঘাট শিবিরের দিকে থেকে বিধায়ক কুণাল ঘোষের দাবি, তৃণমূল থেকে পাওয়া ২৫ লক্ষ টাকা এই দুই বিধায়ক শুধু প্রার্থী হিসেবে খরচ করেছেন এমন নয়, তাঁরা দলের যে অ্যাকাউন্টগুলির লেনদেন নিয়ে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন, সেই অ্যাকাউন্ট থেকেই এঁদের কাছে ভোটের আগে ওই ২৫ লক্ষ টাকা গিয়েছে। ঘটনা হলো, ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির শরৎ বোস রোডের একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল শনিবার জানান, ওই অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে রবিবার কুণাল নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া নথির প্রতিলিপি দেখিয়ে বলেন, ‘কমিশনে ঋতব্রত দাবি করেছেন, ভোটে তাঁর খরচ হয়েছে ২৬,৮৬,০৩৬ টাকা। এই টাকার মধ্যে ২৫ লক্ষ টাকা তৃণমূলের এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থেকে গেছে বলে তিনিই জানিয়েছেন। এই নথিতে ২৫ লক্ষ টাকা পার্টি ডোনেশন হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্ট নিয়ে ঋত এখন প্রশ্ন করছেন!’
যদিও পাল্টা ঋতব্রতর বক্তব্য, ‘আমি অথবা সন্দীপন শুধু নয়, তৃণমূলের ২৯১ জন প্রার্থীই টাকা পেয়েছেন। কুণাল ঘোষ নিজেও পেয়েছেন। উনি নতুন কোনও তথ্য দেননি। প্রচারে ভেসে থাকার জন্য উনি এইসব করছেন।’ কমিশনে জমা পড়া নথি দেখিয়ে তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়েছে, সন্দীপন নির্বাচনী খরচ ২৭ লক্ষ টাকা দেখিয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ লক্ষ টাকা তিনি তৃণমূলের ওই বিতর্কিত অ্যাকাউন্ট থেকেই পেয়েছেন। কুণালের প্রশ্ন, ‘তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে যদি গণ্ডগোল থাকে, তা হলে আপনারা টাকা নিলেন কেন? এই টাকা ফেরত দিন। দেশের আইন বলছে, যদি কালো টাকা অথবা অনৈতিক টাকা ভোটে ব্যবহার হয়ে থাকে, তা হলে সেই নির্বাচন অবৈধ।’
কুণাল এই প্রশ্ন তুললেও ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির মনে করছে, পুলিশ তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করে দেওয়ার ফলে কালীঘাট এখন বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়কদের খরচের হিসেব তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে। তবে এই কৌশলে ঋতব্রত–সন্দীপনদের চাপে ফেলা যাবে না বলেও ওই শিবিরের বক্তব্য।
তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট নিয়ে এই বিতর্কের মধ্যেই মহুয়া মৈত্র ও কুণাল কয়েক দিন ধরে কাকলি ঘোষদস্তিদারের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী সাংসদের আক্রমণ করছেন। যদিও বিদ্রোহী সাংসদ শিবিরের অন্যতম মুখ শতাব্দী রায় রবিবার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘ওঁরা ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। আমাদেরও বলার অনেক কিছু রয়েছে, কিন্তু বলছি না। আমাদের ২০ জনের বাইরে যে ৮ জন রয়েছেন তাঁদের কেউ কেউ অন্য দলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, মন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ওঁদের নেওয়া হচ্ছে না।’