বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটেই বড় চমক। সোমবার বিধানসভায় পেশ হওয়া বাজেট, মহিলা থেকে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য কল্পতরু নয়া রাজ্য সরকার। মহার্ঘ ভাতা (DA) থেকে বিপুল নিয়োগের ঘোষণা, প্যারাটিচার থেকে আশাকর্মীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি। শিক্ষা থেকে শিল্প, স্বাস্থ্য থেকে কৃষি— বাজেট ঘোষণায় বাদ পড়েনি কোনও ক্ষেত্রই। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, একদিকে জনমুখী ও একদিকে সংস্কারমুখী এই বাজেট। এ দিনের বাজেট প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘এই বাজেটের পরে তো বিরোধীদের বলার আর কিছুই নেই।’ পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারকেও খোঁচা মারতে ছাড়েননি তিনি।
বাজেট কতটা সন্তোষজনক তা বোঝাতে এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু তুলে ধরেন বহুবারের বিধায়ক এক বিরোধী বিধায়কের কথা। পেশায় আইনজীবী ওই বিধায়ক সমালোচনা করার কিছু না পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে নাকি বলেছেন, ‘কিছুই তো বলার নেই। তবু বলব, আইনজীবীদের জন্য কিছু থাকলে ভালো হতো।’ বাজেটের কথা বলতে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁর কথায়, ‘এই বাজেটে পাহাড়ও হাসছে, তরাই-ডুয়ার্সও আছে, সুন্দরবনকেও বাঁচানোর কথা আছে। উত্তরবঙ্গে IIT, AIIMS-এর কথাও আছে। বলে শেষ করা যাবে না।’ তবু তাও যদি কোনও ক্ষেত্রে ফাঁকফোকর থেকে থাকে, শীঘ্রই তা মিটিয়ে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, ‘২০২৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে পরবর্তী বাজেটে বাকি ফাঁকফোকর মেকআপ করে ফেলা হবে।’
একইসঙ্গে পূর্বতন বাম সরকার ও তৃণমূল সরকারকেও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বন্ধু হিসেবে কয়েকটা মাস দিন আমাকে। নতুন অর্থমন্ত্রীর সবটা বুঝতে সময় লাগবে। এর আগে একজনকে ৩৪ বছর সময় দিয়েছেন। তারা চিরকুটে নিজেদের লোককে চাকরি ও তালা লাগানোর কাজ ছাড়া আর কিছু করেননি। আরেকজন গত ১৫ বছরের সাদা খাতায় চাকরি দিয়েছেন। এরাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় কথা বলেন।’ নাম না করে বাম ও তৃণমূলকে কটাক্ষ করে তাঁর চ্যালেঞ্জ যে, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যত সমালোচনা হবে তত কাজের গতি বাড়বে।
চলতি বছরে ৪ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে। কর্মসংস্থানে ‘ত্রিফলা’ বা ‘ত্রিশক্তি’ পেয়েছে অগ্রাধিকার। ‘ত্রিশক্তি’-এর ব্যাখ্যায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, আসলে তিন ভাগে রাজ্যে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে এই বিজেপি সরকার। চলতি বছরে সরকারি ক্ষেত্রে মোট ১ লক্ষ কর্মী নিয়োগ করা হবে। এর ৫০% শিক্ষাক্ষেত্রে আর বাকি পুলিশ, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল, বনকর্মী ও সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া ওবিসি জটে আটকে থাকা ১৬ হাজার কনস্টেবল পুজোর আগেই কাজে নামবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে কোনও পক্ষপাত বা দুর্নীতি রুখতে UPSC-এর আদলে নিয়োগের সরকারি ভাবনার কথাও জানান তিনি। এ ছাড়া, তৃতীয় ক্ষেত্রে যে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা নিজ উদ্যোগে কোনও ব্যবসা করার কথা ভাবলে কেন্দ্রের প্রকল্প অনুযায়ী দেওয়া হবে ভর্তুকি বলে আলাদা করে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
চাষের কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহারে ইউনিট প্রতি ২ টাকা ছাড়ের ঘোষণা রাজ্য বাজেটে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকারের পূর্ণ সুবিধা পাবেন চাষিরা। শিল্প ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতেও একাধিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। এর মধ্যে মূলত শিল্পপতিদের থেকে তোলাবাজি রুখতে যে বিশেষ নিয়ম আনা হচ্ছে তা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
সরকারি কর্মচারীদের DA বৃদ্ধি থেকে আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের মাসিক সাম্মানিক পাঁচ হাজার টাকা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশাকর্মী, ICDS কর্মীরাই হেলথ সেক্টরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আপনারা অনেক কাজ করেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চার হাজার টাকা চাইতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খেয়েছেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে না চাইতেই দিয়েছে।’ অর্থমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করে বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সরকারের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন,‘আমরা ভেবেচিন্তে কথা দিই। আর ভালো ভাবে কথা রাখি।’