• তৃণমূলে সাসপেন্ড অভিষেক, মমতাকে সরিয়ে নয়া কমিটি! চরম সিদ্ধান্ত বিদ্রোহীদের
    eTV Bharat | ২২ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 22 জুন: ​রাজ্য রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই অভাবনীয় এবং বেনজির পালাবদল। একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরেই যাঁকে অঘোষিত 'সেকেন্ড ইন কম্যান্ড' বা সর্বময় কর্তা বলে মনে করা হতো, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই এবার সরাসরি সাসপেন্ড করল তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির। নিউটাউনের এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত মেগা বৈঠক থেকে বিদ্রোহীদের এই চরম সিদ্ধান্ত ঘিরে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে বঙ্গ রাজনীতিতে। শুধু তাই নয়, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে দলের রাশ এবার পাকাপাকিভাবে নিজেদের হাতে তুলে নিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহারা।

    ​সোমবার নিউটাউনের নভোটেলে তৃণমূল ভেঙে বেরিয়ে আসা বিদ্রোহী বিধায়ক এবং প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এক মেগা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদীয় দল এবং সংসদীয় দলের পর তৃণমূলের সংগঠন যে একেবারে ভেঙে খানখান, তা এই দিনের ছবিতেই স্পষ্ট। কলকাতা পুরসভার 50 জনেরও বেশি সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর ছাড়াও মুর্শিদাবাদ ও বহরমপুর থেকে একাধিক প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি এই বৈঠকে যোগ দিয়ে বিদ্রোহী শিবিরে নিজেদের নাম লেখান। অসীম বসু, জুঁই বিশ্বাস, তারক সিংহের মতো পরিচিত মুখদের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, অরূপ রায় এবং প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নেতারা।

    সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এদিনের সভাকক্ষে দলের জোড়াফুল প্রতীক জ্বলজ্বল করলেও, কোথাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ছবি বা নামটুকুও ছিল না। এই মেগা বৈঠক থেকেই অভিষেককে সাসপেন্ড করার বিষয়ে চূড়ান্ত শিলমোহর দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত বিদ্রোহী শিবিরের এক নেতার কথায়, "দলের অন্দরে চলতে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণেই আজ সর্বসম্মতভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।"

    এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত 'নব তৃণমূল ব্লক' তাদের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে। সেই কমিটিতে মমতার জায়গা নিয়েছেন হাওড়া মধ্য-র বিধায়ক অরূপ রায়, যাঁকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। নবগঠিত এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাবিনা ইয়াসমিন। কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন আখতারুজ্জামান। অন্যদিকে, অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম এবং রথীন ঘোষকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে।

    ক্ষমতার এই হাতবদল প্রসঙ্গে বিদ্রোহীদের স্পষ্ট দাবি, "নতুন তৃণমূলের রাশ এখন সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। তাই সংগঠনকে ঢেলে সাজাতেই শীর্ষ পদগুলিতে এই রদবদল করা হল।" তবে এত দ্রুত নতুন সংগঠন তৈরি হওয়ার পর বিদ্রোহীরা এবার সরাসরি দলের প্রতীকের আইনি অধিকার দাবি করবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

    ​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহের সূত্রপাত বেশ কিছুদিন আগেই। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে 70 জন বিধায়কের সই সম্বলিত একটি রেজোলিউশন জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সই নিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে আপত্তি তোলেন এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

    স্পিকারের কাছে গিয়ে নালিশ ঠুকে তাঁরা অভিযোগ করেন, "আমরা ওই রেজোলিউশনে কোনও স্বাক্ষর করিনি, আমাদের সই সম্পূর্ণ জাল করে বিধানসভায় তা পাঠানো হয়েছে।" এরপর মামলার জল গড়ায় কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত এবং শেষমেশ স্পিকার ঋতব্রতকেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সেই থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে একের পর এক হেভিওয়েট নেতা ভিড় জমাতে শুরু করেন ঋতব্রতর শিবিরে।

    ​দলের অন্দরে যখন এমন ঘোরতর সংকট, ঠিক তখনই বাইরের আইনি চাপও ক্রমশ চেপে বসছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। আমফানের ত্রাণ বিলিতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফলতা থানায় নতুন করে এফআইআর দায়ের করেছেন বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববি। এর আগে বিষ্ণুপুর থানাতেও ঠিক একই অভিযোগে সরব হয়েছিলেন তিনি। ফলতার অভিযোগে মৎস্যজীবী ও গৃহনির্মাণ ত্রাণ বাবদ প্রায় 47 কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ বণ্টনে বেনিয়মের কথা বলা হয়েছে।

    অভিযোগপত্রে বিজেপি নেতা ববি উল্লেখ করেছেন, "উপভোক্তা তালিকায় ভুয়ো রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সম্ভাবনা প্রবল। এই দুর্নীতির শিকড় খুঁজতে আমরা নিরপেক্ষ এফআইআর এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছি।" এই হাই-প্রোফাইল মামলায় অভিষেকের পাশাপাশি তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির খান এবং ফলতার তৎকালীন বিধায়ক শঙ্করকুমার নস্করের নামও জড়ানো হয়েছে।

    সব মিলিয়ে, একদিকে দলের অন্দরে ক্ষমতাচ্যুতি এবং অন্যদিকে পুলিশের খাতায় দুর্নীতি মামলার আইনি জাঁতাকল - জোড়া ফলায় রীতিমতো বিদ্ধ একদা তৃণমূলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব।
  • Link to this news (eTV Bharat)