• বাঁকুড়া-বীরভূমে ডিফেন্স হাব, দুর্গাপুরে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট, শিল্পে ঢালাও ঘোষণা বাজেটে
    এই সময় | ২৩ জুন ২০২৬
  • বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি এবং বীরভূমের সাঁইথিয়ার শিল্পপার্কে ‘ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ (প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি কেন্দ্র) গড়ে তোলা হবে। সোমবার বাজেটে ঘোষণা করল বিজেপি সরকার। সেই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলের পরিকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দুর্গাপুরে ‘সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট’ তৈরির ঘোষণাও হলো।

    জমি নীতি নিয়েও পর্যালোচনা শুরু করেছে সরকার। জানিয়েছে, বড় বিনিয়োগের সুবিধার্থে ১৯৭৬ সালের ‘আরবান ল্যান্ড সিলিং’ আইনটি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে, যাতে সহজে বড় শিল্পের জন্য জমি পাওয়া যায়। রাজ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ‘West Bengal Investment Promotion Framework’ চালু করা হচ্ছে। এতে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। পরিবেশবান্ধব শক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে জোর দিতে একটি নতুন ‘ইনসেন্টিভ পলিসি’ আনা হচ্ছে, যার জন্য ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে সংশ্লিষ্ট আইনেও সংশোধন করা হবে। তাতে সুরক্ষাবিধি বজায় রেখে দোকান, রেস্তোরাঁ, অফিস ও লজিস্টিক পরিষেবা ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা যাবে। শুরুতে এটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতা ও বড় শহরগুলোতে চালু হবে।

    হাওড়া-হুগলির পাটশিল্প এবং শিলিগুড়ি-দার্জিলিংয়ের চা ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। পাশাপাশি জানিয়েছে, চা বাগানের ভিতরকার রাস্তা ও পরিকাঠামো ঠিক করতে এবং শিলিগুড়িতে একটি আধুনিক ‘কমন টি প্রসেসিং সেন্টার’ গড়তে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কলকাতা বন্দরের সঙ্গে যৌথ ভাবে একটি বিশ্বমানের ‘টি প্রসেসিং জোন’ (প্যাকেজিং ও নিলামকেন্দ্র-সহ) তৈরি হবে। পাট শিল্পকে নতুন রূপ দিতে এবং পাটের তৈরি জিনিসে বৈচিত্র্য আনতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় চালু করা হবে ন্যাশনাল ফাইবার মিশন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুরের তাঁত এবং কুশমন্ডির কার্পেট শিল্পের উন্নতির জন্য সেখানে একটি ‘টেক্সটাইল পার্ক’ তৈরি করা হবে।

    শিল্পে উত্তরবঙ্গকে বিশেষ জোর দিয়েছে সরকার। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়িকে একটি বড় লজিস্টিক ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ২৬ কোটি টাকা খরচে শিলিগুড়ি আইটি পার্কের ভিতরে নতুন করে ৫০,০০০ স্কোয়্যার ফুট জায়গা তৈরি করা হবে। বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল সীমান্তের চেকপোস্ট এবং ল্যান্ড কাস্টম স্টেশনগুলিতে ট্রাক টার্মিনাল, টেস্টিং ল্যাব ও কোল্ড চেন তৈরি করতে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘এক্সপোর্ট প্রমোশন মিশন’-এর সাহায্য নেওয়া হবে।

    আগামী ৩ মাসের মধ্যে নতুন স্টার্ট-আপ নীতি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছে সরকার। বাজেটে ঘোষণা হয়েছে, নতুন ব্যবসার সুবিধার্থে ৪০ কোটি টাকার ‘ইনকিউবেশন ফান্ড’ ও ৬০ কোটি টাকার ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড’-এর ব্যবস্থা থাকবে। তরুণ উদ্যোক্তা এবং নতুন স্টার্ট-আপদের সাহায্য করতে চালু হবে উদ্যম ক্রেডিট কার্ড। এর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ যুবককে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে (যার মধ্যে ৫ লাখ টাকা অনুদান বা গ্র্যান্ট এবং বাকি ৫ লাখ টাকা সুদহীন ঋণ)। এর জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিশ্বমানের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বাংলায় টেনে আনতে এবং ডিপ-টেক স্টার্ট-আপ তৈরিতে সাহায্য করতে ৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল তৈরি হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গকে কৃত্রিম মেধা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কেন্দ্র বানাতে স্ট্যাম্প ডিউটি ও বিদ্যুৎ বিলে ছাড়-সহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের কাজে লাগিয়ে কলকাতাকে পূর্ব ভারতের প্রধান আইটি হিসেবে দাঁড় করানোরও প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে।

    হস্তশিল্পী ও কারিগরদের সাহায্য করতে পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা চালু হবে। এতে নারী, তফসিলি জাতি-জনজাতি ও ওবিসি সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও হস্তশিল্পের আধুনিকীকরণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের টেক্স-র‌্যাম্পস কর্মসূচি চালু হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করা হবে একটি জাতীয় টেক্সটাইল ডিজাইন প্রতিষ্ঠান। সরকার জানিয়েছে, ১০০ কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত বা জেলা পরিষদ থেকে আলাদা করে অনুমতি নিতে হবে না। রাজ্য স্তরের সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে সব ছাড়পত্র দেওয়া হবে। নিয়মকানুন সহজ করতে ৪ মাসের মধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হবে। সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার হাতে পড়ে থাকা অব্যবহৃত জমির হিসেব নিয়ে একটি স্বচ্ছ জমিব্যাঙ্ক তৈরি হবে। লিজ় নেওয়ার পরেও যারা দীর্ঘদিন জমি ফেলে রেখেছে, তাদের থেকে জমি ফেরত নিয়ে নতুন বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হবে। ১১৮ বছরের পুরনো কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার কথাও ভেবেছে সরকার। তা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব ভারতের বণিক মহলের উপকারই হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)