এই সময়: বহিষ্কারের পাল্টা চেয়ার কাড়া!
গত ১ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আর সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্ব। ২১ দিনের মাথায়, সোমবার ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী–তৃণমূল ‘মধুর প্রতিশোধ’ নিল। তারা তৃণমূলের চেয়ারপার্সনের পদ থেকেই সরিয়ে দিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে! সেই জায়গায় আনা হলো হাওড়ার তৃণমূল নেতা অরূপ রায়কে।
তবে মমতাকে দলের মার্গদর্শক হিসেবে রাখতে আপত্তি নেই বিদ্রোহী তৃণমূলের। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবশ্য সেটুকু ‘সম্মান’ও দিতে রাজি নন ঋতব্রতরা। খাতায়–কলমে এখনও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেককে তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষা করারই কৌশল নিয়েছে বিদ্রোহী শিবির। সোমবার নিউ টাউনের একটি হোটেলে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে কোনওরকম পুনর্বাসন ছাড়াই অভিষেককে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এমনকী, সংবাদিকরা অভিষেককে নিয়ে ঋতব্রতকে প্রশ্ন করলে তিনি যেন কোন অভিষেক, সেটাই শনাক্ত করতে পারছিলেন না!
অভিষেক সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে ঋতব্রতর প্রতিক্রিয়া, ‘কোন অভিষেক? আমাদের এ দিনের বৈঠকে চার জন অভিষেক হাজির ছিলেন। এখন বুঝতে পারছি, আপনারা চার্টার্ড অভিষেকের কথা বলছেন।’ ঋতব্রত জানিয়েছেন, এ দিনের বৈঠকে অভিষেককে নিয়ে কোনও কথা হয়নি। বিদ্রোহী শিবিরের এক নেতার কথায়, ‘অভিষেক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এই তাচ্ছিল্যই আসলে মধুর প্রতিশোধ।’
অভিষেককে নিয়ে কথা না হলেও তাঁকেও এ দিন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বিদ্রোহী তৃণমূল। তাদের তৈরি করা নতুন কমিটি অনুযায়ী, চার জনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং সাবিনা ইয়াসমিন। তবে বিদ্রোহী তৃণমূলের এ সব সিদ্ধান্ত মানতে চাইছেন না কালীঘাটের নেতৃত্ব। তাদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তৃণমূল সমার্থক। ফলে কে কোন হোটেলে বৈঠক করে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে কিছু এসে যায় না। কালীঘাট শিবিরের তরফে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র বলেন, ‘দলের সংবিধান অনুযায়ী এ রকম করা যায় না। তৃণমূলের সংবিধানে স্থায়ী চেয়ারপার্সন হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই আছে। তাঁকে সরানো যায় না।’ তবে তৃণমূল সংবিধান অনুযায়ী, দলের চেয়ারপার্সন পদটি চিরস্থায়ী কোনও বন্দোবস্ত নয়। এই পদেও নির্বাচন হওয়ার কথা। এ দিন নিউ টাউনের হোটেলে বিদ্রোহী তৃণমূলের ‘স্পেশাল সেশন’ শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে ঋতব্রত বলেন, ‘আমরা যা করছি, দলের সংবিধান এবং আইন মেনে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে কিছু হচ্ছে না।’ এখনও কালীঘাট শিবিরের ফোল্ডে থাকা কুণাল ঘোষের দাবি, ‘তৃণমূল মানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাদবাকি যা হচ্ছে, সেটা সার্কাস। যাঁকে দল বহিষ্কার করেছে, তিনিই তৃণমূলের স্পেশাল সেশন ডাকছেন। এটা কমেডি শো ছাড়া আর কী হতে পারে!’ জবাবে ঋতব্রত বলেন, ‘সার্কাস হচ্ছে কি না, সেটা নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে।’
শুধু সাধারণ সম্পাদকের পদ নয়, বিদ্রোহী তৃণমূল এ দিন দলের নতুন সর্বভারতীয় সহ–সভাপতিদের তালিকাও প্রকাশ করেছে। সেখানে সহ–সভাপতির চেয়ার দেওয়া হয়েছে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস এবং রথীন ঘোষকে। যদিও অরূপ সাংবাদিকের এ দিন বলেন, ‘তৃণমূল তৃণমূলেই আছে। আমি মমতাদির সঙ্গেই আছি। আমি তৃণমূল, তৃণমূল, তৃণমূল।’
সব মিলিয়ে তৃণমূলে এখন ভাঙন–বিদ্রোহ পর্ব আরও টানটান। রাজ্যের শাসকদল বিজেপি হলেও খবরের ঘনঘটায় বিরোধী দল তৃণমূলের বিভিন্ন শিবির বেশ কয়েক কদম এগিয়ে! মঙ্গলবারও নতুন রাজনৈতিক ডেভেলপমেন্টের বার্তা দিয়ে বিদ্রোহী তৃণমূলের নেতা ঋতব্রত বলেন, ‘এনসিপিআই–এর সাংসদদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ঠিক কী রকম, সেটা কাল জানানো হবে।’ এ দিন নিউ টাউনের হোটেলে ২৯ জনের জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি ঘোষণা করেছে বিদ্রোহী শিবির। দ্রুত নতুন রাজ্য এবং জেলা কমিটি ঘোষণা হবে বলেও জানিয়েছেন ঋতব্রত। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তৃণমূলের এ দিন ‘স্পেশাল সেশন’–এ কোথাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছিল না। মঞ্চে ছিল মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাবা সাহেব আম্বেদকর এবং কাজী নজরুলের ছবি।
কেন মমতার ছবি নেই, সেই প্রসঙ্গে বৈঠকে হাজির কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘এটা মমতাদিরই শিক্ষা। এটা মমতাদির অনুপ্রেরণাতেই হয়েছে। উনি মনীষীদের সম্মান করতে শিখিয়েছেন।’ অরূপ ছাড়াও আরও অনেক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার বিদ্রোহীদের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিধানসভা অধিবেশন শেষ হলে জেলা ভিত্তিক কর্মসূচি ঘোষণা করে দেওয়া হবে। ঠিক করা হবে দলের নতুন মুখপাত্রদের নামও। তৃণমূলের অন্দরের এই দড়ি টানাটানিকে কটাক্ষ করে বঙ্গ–বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘ওদের পার্টি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূত্র মেনে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’
তবে তৃণমূলের শীর্ষ পদে বিদ্রোহীরা কেন অরূপ রায়কে বসালেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ঋতব্রত বলেন, ‘১৯৯৮–এ পার্টির জন্মলগ্ন থেকে অরূপ রায় তৃণমূলের সঙ্গে আছেন। সব গুরুত্বপূর্ণ দলিলে ওঁর সই আছে।’ বিদ্রোহীদের দেওয়া তৃণমূলের শীর্ষ পদ পাওয়ার পরে অরূপ রায়ের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘কর্মীদের ভালো রাখাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’