এই সময়: রাজ্যে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নতুন দিশা বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের। ৩৪ বছরের বাম ও ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায় বাংলায় শিল্প অবহেলিত হয়েছিল বলে বারবার অভিযোগ তুলেছে গেরুয়া শিবির। শিল্পের খরা কাটানো যে বিজেপি সরকারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য— সে কথা একাধিকবার বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি ভিশন উঠে এল সোমবার শুভেন্দুর অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেটে।
এ দিন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে বাজেট পেশ করলেন, সেখানে ‘আর্বান ল্যান্ড সিলিং আইন’ এবং ‘শপস অ্যান্ড এস্টাব্লিশমেন্ট আইনে’ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় তুলে দেওয়া ইনসেনটিভ পলিসিও ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি সরকার। শিল্পসংস্থাকে ইনসেনটিভ দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল তৈরি করছে নবান্ন। গ্রিন এনার্জি, সেমিকনডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষার মতো শিল্প ক্ষেত্রে যাঁরা বিনিয়োগ করবেন, তাঁরা এই তহবিল থেকে ইনসেনটিভ পাবেন।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে বিনিয়োগ আনার পথে তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ যাতে বাধা তৈরি করতে না পারে, তাও বিজেপি নিশ্চিত করবে বলে গেরুয়া নেতৃত্ব আশ্বাস দিয়েছিলেন। ভোটের ফল প্রকাশের পরে শমীক একাধিকবার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ভারী শিল্প প্রয়োজন। তাঁরই সুরে রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় প্রকাশ্যে বলেছেন, সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীকে তাঁরা ফিরিয়ে আনতে চান। এই প্রেক্ষাপটেই বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে। ‘আর্বান ল্যান্ড সিলিং আইন’ নিয়ে বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই পলিসি বড় বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক। যার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। জমির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ‘আর্বান ল্যান্ড (সিলিং অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যাক্ট ১৯৭৬’ আবার পর্যালোচনা করা হবে।’
পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানায় ভূমি সংস্কার করে সিলিং বহির্ভূত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল। রাজ্যে ছোট ছোট প্লটের সংখ্যা বেশি। এই কারণে একলপ্তে বেশি জমি পাওয়া সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও তৎকালীন বাম সরকারকে এই সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। এই আইন সংশোধিত হলে জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতা থাকবে না বলে মত রাজ্য সরকারের। বাজেটের পরে বিধানসভার প্রেস কর্নারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘ফুড প্রসেসিং–সহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগের জন্যই ল্যান্ড সিলিংয়ের পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।’
এর পাশাপাশি ১৯৬৩–এর ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল শপস অ্যান্ড এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট’ কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে বলে বিজেপি সরকার মনে করছে। এই আইনে সংস্কার করে কলকাতা–সহ রাজ্যের বড় শহরগুলিতে আগে অর্থনৈতিক কার্যকলাপে গতি আনতে চাইছে রাজ্য সরকার। বাজেট ভাষণে স্বপন বলেন, ‘উপযুক্ত সংশোধনী ও সংস্কার এনে, শ্রম সুরক্ষা নিশ্চিত করে, দোকান, রেস্তোরাঁ, অফিস, লজিস্টিক্স পরিষেবা, হসপিটালিটি প্রতিষ্ঠান ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করছি। এই সংস্কারের ফলে পশ্চিমবঙ্গ একটি আধুনিক বিনিয়োগ–বান্ধব রাজ্যে পরিণত হবে।...শহরাঞ্চলে বেশি কর্মসংস্থান হবে, বেশি রাজস্ব আসবে এবং অর্থনৈতিক ভাবে আরও গতিশীল হবে।’
বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছেন, বাম জমানায় ধর্মঘট–লকআউট এবং তৃণমূল জমানায় তোলাবাজি রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকে শেষ করে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ— বাম জমানায় কারখানায় ‘তালা’ এবং তৃণমূল জমানায় ‘তোলাবাজি’র ফলে শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। রাজ্যে শিল্প ফেরাতে গেলে আইনে সংস্কার করার পাশাপাশি উদ্যোগীপতিদের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে ৫ হাজার কোটি টাকার ইনসেটিভ পলিসি গ্রহণের পাশাপাশি ‘ইজ় অব ডুয়িং বিজ়নেসে’র লক্ষ্যে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। শুভেন্দুর কথায়, ‘আগে এখানে রাজ্য স্তরে চুক্তি হতো। জমি দেওয়া হতো, উদ্যোগীরা ঋণ নিতেন। ওখানে (শিল্পের জায়গায়) কেউ প্ল্যান আটকে দিত, ট্রেড লাইসেন্সের জন্য তোলা দিতে হবে বলা হতো। ফায়ার লাইসেন্স আটকে দেওয়া হতো। এই স্থানীয় হয়রানি থেকে এ বার উদ্যোগীরা মুক্তি পাবেন।’ ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ নীতিতে একশো কোটি অথবা তার বেশি বিনিয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে জেলা পরিষদ কিংবা পঞ্চায়েত স্তর থেকে ট্রেড লাইসেন্স–সহ অন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হবে না। নবান্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি এর অনুমতি দেবে। মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘কর্মসংস্থান তৈরি করবে, এমন উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
রাজ্যে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির এই উদ্যোগ নিয়ে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা ব্যবসার অনকূল পরিবেশের বিরোধিতা করছি না। কিন্তু সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বেসরকারি সংস্থাগুলিই মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা করে চলে যায়। সেটা সাধারণ মানুষের জন্য হিতকর হয় না।’ যদিও এখনও কালীঘাট নেতৃত্বের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করব না। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৈরি করে গিয়েছেন।’ ‘ল্যান্ড সিলিং আইন’ সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘এই আইনের কোনও সংস্কার ছাড়াই সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠী বিনিয়োগ করতে এসেছিল। ল্যান্ড সিলিং আইনে সংস্কার করে ভূমি সংস্কারের বিপরীত পথে বিজেপি চলতে চাইছে কি না, তা আমরা লক্ষ্য রাখব।’