‘বাবা, চারদিকে আগুন, আমাকে বাঁচাও।’ এটাই ছিল সুখমণি সিংয়ের (২৩) শেষ ফোনকল। সোমবার দুপুরে বাবাকে ফোন করেছিলেন তিনি। ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখায় দাউদাউ করে জ্বলছে উত্তর-পশ্চিম লখনৌয়ের আলিগঞ্জের বহুতল। নিজেকে বাঁচাতে কেউ জানলা দিয়ে ঝাঁপ মারছেন, কেউ সরু তার ধরে ঝুলছেন। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় সুখমণিরও।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, আলিগঞ্জের ওই বহুতলে একটি কোচিং সেন্টার চলত। পড়ুয়াদের ভিড় লেগে থাকত সব সময়ে। সোমবার দুপুরেও বহু ছাত্রছাত্রী সেখানে পড়তে গিয়েছিলেন। ওই বিল্ডিংয়ের দোতলায় কোচিং সেন্টার, পাশেই গেমিং জ়োন। নীচে একটি পেট শপ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রথমে গ্রাউন্ড ফ্লোরের পেট শপেই আগুন লাগে। পরে তা কোচিং সেন্টার-সহ গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঠিক কী কারণে আগুন লাগে, তা মঙ্গলবার সকালেও স্পষ্ট নয়। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন। দমকল কর্মীরা ২৪ জনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়।
দুপুর ২টো ১৫ মিনিটে প্রভ্যোজিৎ সিংকে ফোন করেন তাঁর ছেলে সুখমণি। কাতর গলায় বলেন, ‘অফিসে আগুন লেগেছে। চারপাশ দাউদাউ করে জ্বলছে। আমাকে বাঁচাও।’ কিন্তু কিছুই করতে পারেননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সেই অসহায় আর্তি এখনও কানে বাজছে সুখমণির পরিবারের সদস্যদের।
সুখমণির মতোই দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে আর এক পড়ুয়া আদিত্য শ্রীবাস্তবের। তাঁর মায়ের অভিযোগের তির দমকল ও উদ্ধারকর্মীদের দিকে। তাঁর অভিযোগ, ‘আগুন লাগার পরে সবাই ভিডিয়ো করছিল। কেউ এগিয়ে যায়নি।’ তাঁর কথায়, ‘ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে ছিল আদিত্য। সেই সময়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে দিলে, আমার ছেলেটা হয়তো বেঁচে যেত।’
অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন আবদুল রহমানও। তিনি একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তাঁর বন্ধু সাদ্দাম শেখ জানান, ৮-১০ মাস আগেই চাকরি পেয়েছিলেন আবদুল। নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন। আবদুলের মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছেন তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবা।
অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে সিট গঠন করেছে যোগী প্রশাসন। ইতিমধ্যেই লখনৌ ডেভেলপমেন্ট অথরিটির দুই আধিকারিক, বিদ্যুৎ দপ্তরের এক কর্মী এবং দমকল বিভাগের এক আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। এখনও পর্যন্ত চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন রামকৃষ্ণ উপাধ্যায় (৪৩), বীরেন্দ্র প্রসাদ শুক্ল (৬২), তুষার কৃষ্ণ জয়সওয়াল (৩১) এবং সুরেশ কুমার সাহু। প্রশাসনের দাবি, তাঁরা যৌথভাবে ওই ভবনের মালিক।
উত্তরপ্রদেশ সরকার জানিয়েছে, ২০১৬ সালে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে বহুতলটি ভাঙার নির্দেশ জারি হয়েছিল। তবে মাত্র দু’মাসের তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কী ভাবে সেই আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যকলাপ চলছিল এবং অগ্নি-নিরাপত্তার নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।